নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) চৌহাট্টা শাখা থেকে ৩৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সুদসহ সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. এমদাদুল হক। তবে ঋণের নথিতে স্বাক্ষর করা একটি ফাঁকা ফরমকে কেন্দ্র করে পরে বড় ধরনের জটিলতায় পড়েছেন তিনি। তার অভিযোগ, আগের ঋণের নথি থেকে স্বাক্ষরযুক্ত একটি পাতা সরিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে সিলেটের আরেক ব্যবসায়ীর ১ কোটি ২০ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের জামিনদার হিসেবে তাকে দেখানো হয়েছে।
এ ঘটনায় ইস্টার্ন ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের মোট ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।
আদালতে দাখিল করা ঋণসংক্রান্ত কাগজপত্র, ব্যাংকের দেওয়া ঋণ পরিশোধের ছাড়পত্র, আইনি নোটিশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া বিভিন্ন নথি পর্যালোচনায় গ্যারান্টি ফরমে একাধিক অস্বাভাবিকতা ও গুরুতর অসংগতির বিষয় উঠে এসেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ অক্টোবর ইবিএলের চৌহাট্টা শাখায় ৩৫ লাখ টাকা ঋণের আবেদন করেন এমদাদুল হক। ওই শাখার তৎকালীন রিলেশনশিপ ম্যানেজার মোহাম্মদ ফয়জুল ইসলাম তার ঋণ অনুমোদনের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।
পরবর্তী সময়ে একই বছরের ২৭ নভেম্বর ব্যাংকে গিয়ে ঋণের মঞ্জুরিপত্রের বিভিন্ন পাতায় স্বাক্ষর করেন এমদাদুল। এর মধ্যে ‘লেটার অব গ্যারান্টি’ শিরোনামের ৩৯ নম্বর পাতার নির্ধারিত স্থানে তিনি স্বাক্ষর করেন। তবে ফরমটির কয়েকটি ঘর ফাঁকা রাখা হয়েছিল। পরে সেগুলো পূরণ করা হবে বলে ব্যাংকের কর্মকর্তা তাকে আশ্বস্ত করেন।
এমদাদুলের ভাষ্য, ঋণের কাগজপত্রের ফটোকপি এবং আগাম স্বাক্ষর করা চারটি চেক ফেরত চাইলেও ব্যাংক কর্মকর্তা বিভিন্ন অজুহাতে সেগুলো ফেরত দেননি। তা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করে নির্ধারিত সময়ের আগেই ঋণের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করেন। পরে ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ব্যাংক থেকে ঋণ পরিশোধের ছাড়পত্র ও হিসাব বিবরণীও পান তিনি।
কিন্তু এর প্রায় দুই মাস পর, ২১ নভেম্বর চৌহাট্টা শাখার ব্যবস্থাপক পরিচয়ে দিপংকর দাস পলাশ নামে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করেন। ফোনে তিনি জানান, বিয়ানীবাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেনের ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ঋণের গ্যারান্টর হিসেবে এমদাদুলের নাম রয়েছে। ফরহাদ ঋণখেলাপি হওয়ায় ওই ঋণের সম্পূর্ণ অর্থ এমদাদুলকে পরিশোধ করতে হবে বলেও জানানো হয়।
ব্যাংক কর্মকর্তার এমন দাবি শুনে বিস্মিত হন এমদাদুল। তার বক্তব্য, ফরহাদ নামে কোনো ব্যক্তিকে তিনি চেনেন না। ফলে ওই ব্যক্তির ঋণের জামিনদার হওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। বিষয়টি যাচাই করতে সিলেটের অর্থঋণ আদালতে দায়ের করা অর্থঋণ মামলা নম্বর ১১৪/২০২৪-এর নথি সংগ্রহ করেন তিনি। সেখানে দেখতে পান, ফরহাদের ঋণের তৃতীয় গ্যারান্টর বা জামিনদার হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এমদাদুলের অভিযোগ, তার আগের ঋণের মঞ্জুরিপত্রের বুকলেট থেকে ৩৯ নম্বর পাতাটি ছিঁড়ে নেওয়া হয়। পরে সেটি পিন দিয়ে ফরহাদের ঋণের নথির সঙ্গে যুক্ত করে ফাঁকা ঘরগুলোতে ব্যাংকের শাখার নাম, প্রতিষ্ঠানের নাম, ঋণের পরিমাণ ও তারিখ জালিয়াতির মাধ্যমে বসানো হয়। এভাবেই তাকে ওই ঋণের জামিনদার হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আদালতে জমা দেওয়া নথিপত্রে গ্যারান্টি ফরমের স্ট্যাম্পের অবস্থান, সিলের ধরন, ছবি ও লেখার মধ্যে বিভিন্ন অসংগতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল ঋণগ্রহীতা ফরহাদ ও তার স্ত্রী জাহানারা খানমের গ্যারান্টি ফরমে ব্যবহৃত স্ট্যাম্প ও সিলের সঙ্গে এমদাদুলের নামে তৈরি ফরমের মিল নেই। এমনকি ফরহাদের ঋণের আবেদনে ছবি না থাকলেও আদালতে দাখিল করা এমদাদুলের গ্যারান্টি ফরমে তার ছবি সংযুক্ত রয়েছে।
ঋণের পরিমাণ কথায় লেখার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অসংগতি দেখা গেছে। মূল ঋণের নথিতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা যেভাবে কথায় লেখা হয়েছে, এমদাদুলের নামে থাকা ফরমে তা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ফরমে তারিখ দেওয়া হয়েছে ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮। অথচ এমদাদুলের দাবি, ২০২২ সালের ১৩ অক্টোবরের আগে তিনি ওই ব্যাংকে কখনো যাননি।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল বিষয়টি জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিলেট শাখায় লিখিত অভিযোগ করেন এমদাদুল। পরে ১৪ মে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইপিসি) অভিযোগের অগ্রগতি জানতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, ইবিএল কর্তৃপক্ষ সেখানে নতুন একটি ‘লেটার অব গ্যারান্টি’ জমা দিয়েছে। ওই নথিতে আদালতে দাখিল করা ফরমের মতো ছবি ছিল না। তবে ঋণের পরিমাণ সঠিকভাবে লেখা হয়েছিল।
চলতি বছরের ২৭ জুলাই আদালতে জেরার সময় ইবিএলের সিনিয়র অফিসার বিপ্রেশ দাশ স্বীকার করেন, ওই ঋণের মূল গ্যারান্টর ছিলেন দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি। পরে দেলোয়ার অব্যাহতির আবেদন করলেও সেই আবেদন কিংবা এ-সংক্রান্ত মঞ্জুরিপত্র আদালতে দাখিল করা হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপ্রেশ দাশ আরও জানান, ফরহাদ হোসেন ও তার স্ত্রী জাহানারা খানমের গ্যারান্টি ফরমে থাকা ব্যাংকের যাচাইকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর তিনি চিনতে পারেননি। তবে এমদাদুল হকের ফরমে থাকা স্বাক্ষরটি ফয়জুল ইসলামের বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
তিনটি গ্যারান্টি ফরমেই ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ উল্লেখ ছিল। ফরহাদ ও তার স্ত্রীর ফরমে ঋণের পরিমাণ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা কথায় লেখা হলেও এমদাদুলের ফরমে ইংরেজিতে ‘এক কোটি বিশ হাজার’ লেখা হয়েছিল। ওই কর্মকর্তা এটিকে টাইপিং বা করণিক ভুল বলে দাবি করেন।
এ ঘটনায় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রধান কার্যালয়ের মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ করেছেন এমদাদুল হক। অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলোর তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনার অপেক্ষায় রয়েছে।


