বীমা খাতে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম অমিমাংশিত

সময়: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩, ২০১৯ ৯:২২:১০ পূর্বাহ্ণ


অনুপ সর্বজ্ঞ : বীমা আইন, ২০১০ পাসের পর ২০১১ সালে গঠিত হয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত খাতটিতে এক হাজার কোটি টাকারো বেশি আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। তবে অনিয়ম চিহ্নিত হলেও তা এখন পর্যন্ত অমিমাংশিত রয়ে গেছে। অভিযুক্ত কোন কোম্পানির বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। কোন কোন ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করা হলেও পরবর্তীতে তার আর কোন অগ্রগতি হয়নি।
এ প্রসঙ্গে আইডিআরএ সদস্য বোরহান উদ্দীন আহমেদ দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিনকে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মেয়াদ যদি আরও কিছুটা বাড়ানো যেতো তাহলে অনেক ঘটনাই অমিমাংশিত থাকতো না। বেশ কিছু ফাইল বছরের পর বছর ঝুলে আছে এটা সত্যি, কিন্তু ওই সময় আমরা দায়িত্বে ছিলাম না।

বোরহান উদ্দীন বলেন, পুরোনো অমিমাংশিত ফাইলগুলোর সঙ্গে গ্রাহক স্বার্থ জড়িত। তাই এগুলো অবশ্যই পুনরায় দেখা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইডিআরএ’র বিশেষ নিরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদনহীন জমি ক্রয়, বীমাপণ্য বিক্রি, গাড়ি বিক্রি, ভুয়া এজেন্টদের কমিশন দেয়া ও অবৈধ বেতন-ভাতার মাধ্যমে ৩২০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ঘটেছে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সে। ২০১২ থেকে ২০১৪ এই তিন বছরে কমিশন খাতেই ৩০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন করেছে কোম্পানিটি। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এ অর্থ দেয়া হয়েছে নিবন্ধন নেই এমন এজেন্টদের। এছাড়া জমি ক্রয়, গাড়ি ক্রয়-বিক্রয় ও পরিচালকদের বেতন-ভাতা বাবদ অনিয়ম হয়েছে আরও ২০ কোটি টাকা। এসব অনিয়ম চিহ্নিত হবার পর ২০১৬ সালে কোম্পানিটির কাছে ব্যাখ্যা তলব করে আইডিআরএ। কিন্তু পরবর্তীতে এ বিষয়ে আর কোন পদক্ষেপ নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
২০১১ সালে আইডিআরএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান অ্যাকচ্যুয়ারি এম শেফাক আহমেদের প্রথম মেয়াদে ভুয়া দলিল করে সরকারি জমি জবরদখল ও শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ প্রমাণও হয়। আইন না মেনে জমি কেনার অপরাধে ২০১২ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের ১১৮ কোটি টাকা বার্ষিক ১২ শতাংশ সুদসহ কোম্পানি খাতে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয় আইডিআরএ। ওই বছরই টাকা ফেরত না দেয়ার উদ্দেশ্যে হাইকোর্টে রিট করে পপুলার লাইফ। কোর্ট পপুলার লাইফের অনুকূলে রায় দেন। তবে রায় কোম্পানিটির পক্ষে গেলেও বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে নেয়ার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি আইডিআরএ। যদিও বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার নোট দিয়েছিলেন আইডিআরএর তৎকালীন এক সদস্য।
২০১১ সালেই প্রাইম ইসলামী লাইফের বিরুদ্ধে অ্যাকচুরিয়াল ভ্যালুয়েশন না করা, অবৈধভাবে লভ্যাংশ বিতরণ, প্রিমিয়াম ও আমানত সংগ্রহ, অবৈধ বিনিয়োগসহ ১৭টি বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পায় আইডিআরএ। এসব অনিয়ম প্রমাণ হওয়ায় কোম্পানিটির ফান্ডে ১০৮ কোটি টাকা জমা দেয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয় আইডিআরএ থেকে। কিন্তু শুধু এ পর্যন্তই। পরবর্তীতে এ বিষয়ে আর কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
এদিকে, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পদের যে তথ্য দিয়েছে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। এই দু’বছরে কোম্পানিটি ১৫৭ কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছে বলে উঠে আসে আইডিআরএ’র নিয়োগ দেয়া বিশেষ নিরীক্ষিক একনাবিনের নিরীক্ষায়। এছাড়া কোম্পানিটির বহুতল ভবন পদ্মা লাইফ টাওয়ার নির্মাণেও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রমাণ পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ভবনটিতে জীবন বীমা তহবিল থেকে অতিরিক্ত ২৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
আইডিআরএ’র বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে আরেক জীবন বীমা কোম্পানি সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৪৩ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের চিত্র। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৯২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে কোম্পানিটি। কিন্তু জীবন বীমা তহবিল থেকে বিনিয়োগ করা এসব অর্থের ৭৫ কোটি কোটি টাকাই অনাদায়যোগ্য। এছাড়া কোম্পানিটিতে প্রায় ৬৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে অনুমোদনহীনভাবে। যার কোন দালিলিক প্রমাণ নেই। একই সময় ৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে।
এছাড়া, আইন ভেঙে বীমা গ্রহীতার সঞ্চয় ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তহবিলের একটি অংশ জামানত হিসেবে রেখে ২০১২ সালে দু’টি ব্যাংক থেকে ১৫১ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। শুধু তাই নয়, উন্নয়ন ব্যয় শিরোনামে দু’বছরে ৩৫ কোটি টাকা খরচ দেখালেও এ বাবদ কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে তার কোন ব্যাখ্যা আইডিআরএতে দিতে পারেনি কোম্পানিটি। এদিকে, সিলেটে কোম্পানির ২০ কাঠার একখণ্ড জমির বাজারমূল্য ৪ কোটি টাকা হলেও কাগজে-কলমে তা দেখানো হয় সাড়ে ৯ কোটি টাকা। একই সঙ্গে পল্টনের ২০ কাঠার জমিটির দাম ১০ কোটি টাকা হলেও কাগজে-কলমে তা দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি টাকা।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৪০০ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged