আইপিও সংকট কাটাতে সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তির দাবি ডিবিএ সভাপতির

সময়: বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬ ১১:৫০:৪৬ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কারের জন্য একগুচ্ছ প্রস্তাব তুলে ধরেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম পর্যালোচনা, ডিএসইকে আরও ক্ষমতায়ন, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডে (সিডিবিএল) ডিএসইর মালিকানা বৃদ্ধি, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশে (সিসিবিএল) ডিএসইর নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আইপিও দ্রুত আনা এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের জন্য একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা (এসআরও) গঠন এখন সময়ের দাবি।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ডিবিএ আয়োজিত ‘পরিচিতি ও মতবিনিময়’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম প্রণয়নের সময় পাঁচ বছর পর এটি পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু প্রায় ১২ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত সেটি পর্যালোচনা করা হয়নি। ডিবিএ এরই মধ্যে কমিশনের কাছে লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিয়েছে। খুব বড় ধরনের পরিবর্তন নয়, বরং এমন কিছু সংশোধন চাওয়া হয়েছে, যা ডিএসইকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করবে।

সিডিবিএলের মালিকানা নিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি গঠনের সময় ডিএসই আর্থিকভাবে শক্তিশালী না থাকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ শেয়ার নিতে পারেনি। অথচ গত দুই দশকে সিডিবিএলের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ডিএসই থেকে, কিন্তু ডিএসইর মালিকানা মাত্র ১৩ শতাংশ। এই বাস্তবতা ন্যায্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ (সিসিবিএল) প্রসঙ্গে ডিবিএ সভাপতি বলেন, ২০১৮ সালে ডিএসই ১৩৫ কোটি টাকা সাবস্ক্রাইব করলেও প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়নি। তার মতে, যেহেতু সিসিবিএলের প্রায় ৯৮ শতাংশ রাজস্ব ডিএসইভিত্তিক লেনদেন থেকে আসবে, তাই এটি ডিএসইর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, বর্তমানে ডিএসইর ৪৫ শতাংশ অংশীদারত্ব অত্যন্ত কম। এটি বাড়িয়ে অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ করা প্রয়োজন। বাকি ১০ শতাংশ সিডিবিএল বা অন্য কোনো অংশীদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে।

আইপিও সংকট নিয়ে ডিবিএ সভাপতি বলেন, বহু বছর ধরেই বাজারে ভালো আইপিওর ঘাটতি রয়েছে। কোনো কোম্পানি আইপিওতে আসার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ৯ মাস থেকে এক বছর সময় লাগে। তাই অন্তর্বর্তী সময়ে সরকারের মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

সিডিবিএলের তালিকাভুক্তির বিষয়টিও দীর্ঘদিনের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একটি পরিপক্ব ও অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান। বাজারে যখন আইপিওর খরা চলছে, তখন সিডিবিএল তালিকাভুক্ত না হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

বাজার মধ্যস্থতাকারীদের জন্য একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সেলফ রেগুলেটরি অর্গানাইজেশন-এসআরও) গঠনের প্রস্তাব দিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, জাপানের জাপান সিকিউরিটিজ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (জেএসডিএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফিনরা-এর আদলে বাংলাদেশেও এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নীতিনির্ধারণে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের তদারকির দায়িত্ব এসআরও পালন করবে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়ন্ত্রক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে বাজার উন্নয়নের কাজও করতে চেয়েছে। কিন্তু বাজার উন্নয়ন, আইপিও আনা বা বিনিয়োগ প্রচারণা কমিশনের মূল দায়িত্ব নয়। এসব কাজ মার্চেন্ট ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জ ও সংশ্লিষ্ট বাজার অংশীজনদের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, মার্চেন্ট ব্যাংক যদি আইপিও আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন মার্চেন্ট ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আইপিও আনার দায়িত্ব মার্চেন্ট ব্যাংকের কাছেই থাকা উচিত, ব্রোকিং কার্যক্রম ব্রোকারদের হাতে এবং মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনার দায়িত্ব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির (এএমসি) কাছেই থাকা উচিত।

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, অতীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে রোডশোর নামে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল কর্মসূচি হয়েছে, যেখানে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও জোরপূর্বক অর্থ নেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থেকে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ দায়িত্বের মধ্যে থেকেই কাজ করা উচিত।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার নাহিদ মাহতাব, তানভীর হাবিব রহমান ও নাফিজ আল তারিক, ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার প্রমুখ।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিবিএ সভাপতির প্রস্তাবগুলো দীর্ঘদিনের পুঁজিবাজার সংস্কারের আলোচনার অংশ। ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম পর্যালোচনা, সিডিবিএল ও সিসিবিএলে ডিএসইর অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং সরকারি কোম্পানির আইপিও আনার বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে কমিশন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

Share
নিউজটি ২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged