নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) কমোডিটি সেগমেন্টকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য কর অবকাশ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সাইফুর রহমান মজুমদার। তিনি বলেন, একটি যুগোপযোগী, আধুনিক ও কার্যকর কমোডিটি বাজার গড়ে তুলতে এ ধরনের কর সুবিধা অত্যন্ত প্রয়োজন।
রোববার (১৪ জুন) দুপুরে অনুষ্ঠিত সিএসইর বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি উত্থাপন করেন। এ সময় সিএসইর চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান, শেয়ারহোল্ডার পরিচালক এমদাদুল ইসলাম, শাহজাদা মাহমুদ চৌধুরী এবং কোম্পানি সেক্রেটারি রাজীব সাহা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটরি) কাঠামো প্রস্তুতের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে সিএসই। বর্তমানে এটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশ্বমানের প্রযুক্তিনির্ভর একটি আধুনিক এক্সচেঞ্জ পরিচালনার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও সীমিত আয়ের মধ্যেই সেই ব্যয় বহন করছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।
এম সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি নতুন ধাপে প্রবেশ করছে। অথচ দেশে এখনো এমন কোনো সংগঠিত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর কমোডিটি বাজার গড়ে ওঠেনি, যেখানে পণ্যের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ মূল্য প্রবণতা সম্পর্কে কার্যকর বাজারভিত্তিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, সরকার কমোডিটি এক্সচেঞ্জ কার্যকর করতে বিদ্যমান লাইসেন্স সক্রিয়করণ, প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিশ্চিত করার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। তিনি জানান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মসহ কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠানটি এই বাজার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট সময়োপযোগী, সাহসী এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে পুঁজিবাজারের আধুনিকায়ন, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নেওয়া বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ স্বাগত জানায়।
তিনি আরও বলেন, বাজেটে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রণোদনা, সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, বাজার অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুততর সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা চালু, নতুন আর্থিক পণ্য ও ইনস্ট্রুমেন্টের তালিকাভুক্তি, বিনিয়োগকারী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সহজ করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত নীতিকৌশল জাতীয় বাজেটের কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এজন্য চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ সরকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, সিএসই দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ ও সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরেছে। এবারের বাজেটে সেই বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী প্রস্তাবগুলোর প্রতিফলন ঘটেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের ব্যবধান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। তবে এ ব্যবধান ১০ শতাংশে উন্নীত করা হলে ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আরও বেশি উৎসাহিত হবে। এর ফলে স্বচ্ছ করপোরেট রিপোর্টিং নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
সিএসইর পক্ষ থেকে আরও প্রস্তাব করা হয়, নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে তিন বছরের জন্য আয়কর অবকাশ দেওয়া হলে অনেক অতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে আসতে উৎসাহিত হবে। এর ফলে পুঁজিবাজারে গুণগত মানসম্পন্ন শেয়ারের সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে লেনদেন ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনাবাসী ব্যক্তিদের কারিগরি বা প্রযুক্তিগত সেবার বিপরীতে প্রদেয় অর্থের ওপর ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ১৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপ করা হয়। এসব হার অর্থমন্ত্রীর ডিজিটালাইজেশন-ভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় উল্লেখ করে তিনি উৎসে কর ১০ শতাংশ এবং মূসক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন।
সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বর্তমান সরকারের সংস্কারমুখী নেতৃত্ব, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং বাজার আধুনিকায়নের কার্যক্রম বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট অপরিহার্য। সরকার বন্ড মার্কেট উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায় সিএসই আশাবাদী। করপোরেট বন্ড, সুকুক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড এবং পৌর বন্ডের বিকাশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


