নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে কারসাজি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, তবে লোকসানি কোম্পানি জিকিউ বলপেন আবারো আলোচনায়। সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পরও কারসাজিকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আজ বাজারজুড়ে দরপতনের দিনেও কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ২৪ টাকা ৩০ পয়সা বা ৪.২৫ শতাংশ। দিনশেষে শেয়ারটি ৫৯৬ টাকা ৭০ পয়সায় ক্লোজ হয়, যা বাজারসংশ্লিষ্টদের বিস্মিত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ঘটনাই প্রমাণ করে যে সিন্ডিকেট শেয়ারবাজারের প্রবণতা তোয়াক্কা করছে না। বরং তারা ইচ্ছেমতো দর বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা তাদের কাছে তুচ্ছ, ফলে বাজার কার্যত কিছু কারসাজিকারীর দখলেই চলে যাচ্ছে।
শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় জিকিউ বলপেন
বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন, জিকিউ বলপেনকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করছে, যাদের সঙ্গে বিএসইসি ও ডিএসইর কিছু অসাধু কর্মকর্তার আঁতাত রয়েছে। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারের অস্বাভাবিক টানাটানি হলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিনিয়োগকারীদের ভাষায়, শেয়ারবাজার যেন তাদের জন্য ‘অরক্ষিত মতিঝিল’।
আজকের লেনদেনে যখন বাজারের ২৮০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে, তখন লোকসানি জিকিউ বলপেনের শেয়ার উল্টো উর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই অস্বাভাবিক আচরণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন।
আর্থিক ভিত্তি দুর্বল, তবুও দরবৃদ্ধি
প্রতিষ্ঠানটি টানা তিন বছর ধরে ঋণাত্মক মুনাফা দেখাচ্ছে।
-
২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি লোকসান (EPS) হয়েছে ৩ টাকা ৫০ পয়সা।
-
২০২৩ সালে লোকসান ছিল ১২ পয়সা।
-
২০২২ সালে লোকসান ছিল ২ টাকা ৬৫ পয়সা।
তারপরও ২০২৪ সালে ৩% এবং আগের দুই বছরে ২.৫০% লোক দেখানো ডিভিডেন্ড দিয়েছে। এর ফলে শেয়ারটি সবসময় কারসাজির কবলে থাকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোম্পানির PE রেশিও নেতিবাচক, পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা কারসাজিকারীদের জন্য সহজ টার্গেট। ফলে তারা ইচ্ছেমতো দর বাড়িয়ে চলেছে।
বিএসসি বনাম জিকিউ বলপেন: অন্যায্য বৈপরীত্য
গত ২২ জুন জিকিউ বলপেনের শেয়ার ছিল ১৬০ টাকার নিচে। ধারাবাহিক উত্থানে আজ সেটি প্রায় ৬০০ টাকায় পৌঁছেছে। অথচ একই খাতের বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) ২০২৪ সালে ২৫% ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে এবং চলতি ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে তাদের EPS দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ২৮ পয়সায়। ধারাবাহিক আর্থিক উন্নতি সত্ত্বেও বিএসসির শেয়ার এখনো ১১৫ টাকার নিচে লেনদেন হচ্ছে এবং আজও দরপতন হয়েছে।
এই বৈপরীত্য বাজারে গভীর প্রশ্ন তুলছে—কেন লোকসানি কোম্পানির শেয়ার আকাশচুম্বী, অথচ মুনাফাবান প্রতিষ্ঠানের শেয়ার স্থবির বা নিম্নমুখী?
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা ও বাজারের ঝুঁকি
বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কেবল জরিমানা বা লোক দেখানো ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দ্রুত ভেঙে পড়বে। তাদের মতে, শেয়ারবাজারকে যদি প্রকৃত বিনিয়োগবান্ধব করতে হয়, তবে সিন্ডিকেট ভেঙে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে।


