বিশেষ প্রতিবেদক: পর্যায়ক্রমে সব গ্রাহকের বকেয়া বীমা দাবি পরিশোধ করবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জীবন বীমা খাতের কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে এসব দাবি পরিশোধ করা হবে। একইসঙ্গে শিগগিরই নতুন উদ্যমে মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন
কোম্পানিটির সদ্য দায়িত্বগ্রহণকারী পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। দায়িত্বগ্রহণের এক সপ্তাহ পর দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দীর্ঘ দিন ধরেই তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ করতে পারছে না ফারইস্ট লাইফ। এরইমধ্যে সরকার পতনের পর গত ২৫ আগস্ট মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামকে চেয়ারম্যান এবং ডা. মো. মোকাদ্দেস হোসেনকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আশাবাদ ব্যক্ত করেন- দেশের শীর্ষস্থানীয় বীমা কোম্পানিটি অচিরেই গ্রাহক এবং জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যমে তার গৌরব ফিরে পাবে।
২০২১ সালের এপ্রিলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফে একটি বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনায় দেশের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়োগ দেয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) । ২০২২ সালের মে মাসে আইডিআরএ‘র কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানিটির ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৩২ কোটি টাকার হিসাব সংক্রান্ত অনিয়ম ধরা পড়েছে।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও এমএ খালেকসহ সাবেক পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই অর্থ আত্মসাতের
সঙ্গে জড়িত। মূলত দুটি উপায়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছিল। একটি বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে জমি কেনা এবং কোম্পানির মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর) বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়া।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সাবেক সভাপতি শেখ কবির হোসেনকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান করে পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়।
তবে কোম্পানিটির মালিকানা পরিবর্তন ও পরিচালনা পর্ষদে পুনর্গঠন করেও কোম্পানিটির তহবিল তছরুপের কোন টাকাই আদায় হয়নি। সর্বশেষ হিসাব সমাপনীর তথ্য বলছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নবায়ন প্রিমিয়াম আয়সহ মোট প্রিমিয়াম আয় কমেছে। ব্যয় বেশি হওয়ায় কমে গেছে কোম্পানিটির উদ্বৃত্ত টাকার পরিমাণ।
অপরদিকে গ্রাহকের মেয়াদ উত্তীর্ণ বীমা দাবির পরিমাণ বাড়ছে প্রতি বছরই। সেই সাথে বাড়ছে নতুন গ্রাহকদের জমাকৃত প্রিমিয়ামের দায়ও।
এই পরিস্থিতিতেও গত বছর ২০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। আইন অনুসারে এ ব্যয় অবৈধ। বেতন-ভাতা খাতেই গত বছর খরচ হয়েছে ৪৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। কোম্পানির তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনিস্পন্ন মেয়াদোত্তীর্ণ দাবির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৮০ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
২০২৩ সালে মেয়াদ উত্তীর্ণ দাবির পরিমাণ ৬শ’ ১৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০২৩ সালে অনিষ্পন্ন দাবি ও নতুন মেয়াদ উত্তীর্ণ দাবির পরিমাণ ২ হাজার ৭শ’ ৯৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে কোম্পানির ওয়েব সাইটের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে দাবি পরিশোধ করা হয়েছে ৪শ’ ৬৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ২ হাজার ৩শ’ ৩০ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এদিকে ২০২৩ সালে ব্যবসা সমাপনীর সাময়িক হিসাব অনুসারে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের প্রিমিয়াম আয়ের হার কমে গেছে। ২০২৩ সালে কোম্পানিটি মোট প্রিমিয়াম আয় করেছে ৬০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। যা আগের বছর ছিল ৬৩৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় প্রিমিয়াম আয় কমে গেছে ৩৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। বা ৬ শতাংশ।
আবার কোম্পানির উদ্বৃত্তের হারও কমে গেছে। ২০২৩ সালে প্রিমিয়াম আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৪৬৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। যা ২০২২ সালে ছিল ৪৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় উদ্বৃত্ত কমেছে ২০ কোটি ৩১ লাখ বা ৪ শতাংশ।
বার্ষিক হিসাব সমাপনী সাময়িক হিসাবের তথ্য অনুসারে ২০২৩ সালে মোট প্রিমিয়াম আয় করেছে ৬০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। যার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৩৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। প্রিমিয়াম আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৪৬৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
আবার ২০২২ সালে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৬৩৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ১৫২ কোটি ৬৮লাখ। প্রিমিয়াম আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে ২০২২ সালের উদ্বৃত্ত ৪৮৬ কোটি ১০ লাখ।
অপরদিকে উদ্বৃত্ত এই টাকা লাইফ ফান্ডে যুক্ত হয়ে লাইফ ফান্ড বাড়ার কথা। অথচ ২০২৩ সালে লাইফ ফান্ড কমে গেছে ৩শ’ ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বছর শেষে লাইফ ফান্ড দাঁড়িয়েছে ১৫৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০২২ সালের শুরুতে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড ছিল ১ হাজার ৭শ’ ২৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। এই এক বছরেই লাইফ ফান্ড কমে গেছে ১ হাজার ২শ’ ৫৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। বছর শেষে লাইফ ফান্ড দাঁড়ায় ৪শ’ ৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
আবার ২০২৩ সালে বিনিয়োগ কমে গেছে ২১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ২০২৩ সাল শেষে মোট বিনিয়োগ রয়েছে ১ হাজার ৯শ’ ২৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। যার মধ্যে সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ডে রয়েছে ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
আগের বছর ২০২২ সালে কোম্পানিটির মোট বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ৯শ’ ৪৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর ২০২২ সালে বিনিয়োগ কমে গেছে ৫শ’ ৫২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২০২১ সাল শেষে বিনিয়োগ ছিল ২ হাজার ৪শ’ ৯৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোম্পানির প্রায় ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
বিগত পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম প্রভাব খাটিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লোপাট করেছেন। এই দুর্নীতির ‘নাটের গুরু’ সাবেক পরিচালক এম এ খালেক। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল সময়ে অর্থ লোপাটের ঘটনাগুলো ঘটে।
অর্থ লোপাটের ছয় খাত সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫-২০১৭ সাল সময়ে ফারইস্টের সাবেক পর্ষদ সদস্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণা করে ছয় খাত থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি ৩১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
খাতগুলো হলো– জমি ক্রয় ও উন্নয়ন, মেয়াদি আমানত মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিট (এমটিডিআর) জামানত, প্রতিকূল বিনিয়োগ, কোম্পানি পরিচালনায় অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা, কোম্পানি পরিচালনায় ধারাবাহিকতা না থাকা এবং কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়ন্ত্রণহীনতা। এর মধ্যে জমি ক্রয় ও উন্নয়নের নামে ৬৬৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং এমটিডিআর জামানত রেখে ঋণের নামে ১ হাজার ৩৩২ কোটি ৩১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।


