নিজস্ব প্রতিবেদক: বন্ধের তালিকায় থাকা ৯টি রুগ্ণ নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ব্যক্তিগত আমানতকারীদের জন্য স্বস্তির খবর দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে রমজান শুরুর আগেই এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের জমাকৃত টাকার আসল অংশ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, চলতি সপ্তাহ থেকেই এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে।
এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রণীত ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর আওতায় দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এবং সংকটাপন্ন ৯টি এনবিএফআই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বন্ধের সিদ্ধান্তে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— ফাস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে মোট আমানতের পরিমাণ ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের জমা রয়েছে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে মৌখিকভাবে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দে সম্মতি দিয়েছে।
গভর্নর আরও বলেন, এই সপ্তাহ থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করা হবে এবং একইসঙ্গে তাদের সম্পদের মূল্যায়ন কার্যক্রম শুরু হবে। সম্পদের মূল্যায়নের মাধ্যমে দায়দেনা পরিশোধের পর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।
এছাড়া বর্তমানে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের ওপর ফরেনসিক অডিট বা বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনার কথাও জানান গভর্নর। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে যারা অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এই নিরীক্ষার মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আমানত পরিস্থিতি তুলে ধরে গভর্নর জানান, গত দুই দিনে এসব ব্যাংক থেকে মোট ১০৭ কোটি টাকা উত্তোলন হলেও একই সময়ে নতুন করে ৪৪ কোটি টাকার আমানত জমা পড়েছে। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক থেকেই সর্বোচ্চ ৬৬ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তবে নতুন আমানত আসাকে গ্রাহকদের আস্থার ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি।
গভর্নর জানান, আগামী ১৯ জানুয়ারি থেকে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে। প্রাথমিকভাবে এটি সরকারি মালিকানায় থাকলেও পরিচালিত হবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। আগামী তিন বছরের মধ্যে উপযুক্ত বিনিয়োগকারীর কাছে ব্যাংকটির মালিকানা হস্তান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংক খাত সংস্কার ও রেজোলিউশন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যতে আরও কিছু ব্যাংক এই উদ্যোগের আওতায় আসতে পারে। তবে পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যা চলতি বাজেটে বরাদ্দ নেই। ফলে এই সংস্কার কার্যক্রম শেষ করার দায়িত্ব পরবর্তী সরকারের ওপর পড়বে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক রেজোলিউশন একটি ব্যয়বহুল কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়া। পরবর্তী সরকার সবুজ সংকেত দিলে এই সংস্কার কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।


