নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের শীর্ষ ৫০ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মাত্র ৯০ হাজার কোটি টাকার জামানতের বিপরীতে ৩.৬৫ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে—যার মধ্যে প্রায় ১.২ লাখ কোটি টাকা ইতোমধ্যেই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। অল্পসংখ্যক গ্রুপের কাছে এতো বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ব্যাংকিং খাতে ঋণঝুঁকি আরও তীব্র হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনা অনুযায়ী, মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ ও অগ্রিম দাঁড়িয়েছে ১৬.৮০ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০.৫২ লাখ কোটি টাকা বা ৬২.৫৯ শতাংশই সীমিত সংখ্যক বৃহৎ করপোরেট গ্রুপের কাছে চলে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রহণকারীদের ‘বৃহৎ ঋণগ্রহীতা’ হিসেবে ধরা হয়। এই তালিকায় রয়েছে—এস আলম গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ এবং নাবিল গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠী।
ঋণের ব্যাপক কেন্দ্রীভবনকে বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা বলে উল্লেখ করছেন। তাদের মতে, কয়েকটি গ্রুপের পরিশোধ সক্ষমতার ওপর পুরো ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে। কোনো একটি বড় গ্রুপ খেলাপিতে পরিণত হলে একই সঙ্গে বহু ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত পুরো ব্যাংকিং খাতে ৪.২ লাখ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে—যা মোট ঋণের ২৪.৮২ শতাংশ। তবে বৃহৎ ঋণগ্রহীতা ক্যাটাগরিতে খেলাপির হার আরও বেশি—২৭.১১ শতাংশ, অর্থাৎ এ শ্রেণির মোট ঋণের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি অ-পারফর্মিং।
বড় গ্রুপগুলোর ঋণ অ্যাকাউন্টে পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের প্রবণতা অন্যদের তুলনায় বেশি। বর্তমানে তাদের পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠিত ঋণের পরিমাণ ১.১৪ লাখ কোটি টাকা, যা বৃহৎ ঋণের মোট অঙ্কের প্রায় ১১ শতাংশ। এরপরও বহু গ্রুপ নিয়মিত পরিশোধে ফিরতে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে খেলাপির পরিমাণ ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটেছে। পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করায় সেপ্টেম্বর ২০২৫ নাগাদ অ-পারফর্মিং ঋণ বেড়ে ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে—যা এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ। এদের মধ্যে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি মামলা চলমান থাকায় আটকে আছে, আর ১.৫ লাখ কোটি টাকা আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি দেখানো যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ নেওয়ার ফলে বড় ঋণগ্রহীতাদের অপরিশোধিত ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছে। এই কেন্দ্রীভবন পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করছে, যা পুরো আর্থিক খাতকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তারা এখন পুনঃতফসিল নীতিমালা কঠোর করা, ঋণ পুনরুদ্ধার জোরদার করা এবং আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের কেন্দ্রীভবন নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে ব্যাংকিং খাত ঝুঁকির মধ্যেই থাকবে।


