রাজনৈতিক নেতৃত্বে অর্থনৈতিক রূপান্তর: খালেদা জিয়ার সংস্কার অধ্যায়

সময়: বুধবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫ ৯:০৯:০৬ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় বেগম খালেদা জিয়া কোনো অর্থনীতিবিদ বা অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। তবে সময়ের ব্যবধানে অর্থনীতিবিদরা এখন একমত যে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক রূপান্তরের বহু গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল তাঁর শাসনামলেই। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর প্রধান শক্তি ছিল নিজে বিশেষজ্ঞ হওয়া নয়; বরং সঠিক দায়িত্বে যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশ যখন রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জর্জরিত ছিল, তখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বই অর্থনীতিকে নতুন করে গতি সঞ্চার করে। তাঁর দৃঢ় রাজনৈতিক সমর্থনের কারণেই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ১৯৯১ সালে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম হন, যা বর্তমানে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট সমর্থন ছাড়া সে সময় এ ধরনের বড় সংস্কার বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব ছিল।

বৈপ্লবিক সংস্কার ও প্রবৃদ্ধির ধারা

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই দেশে আমদানির কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং শুল্ক কাঠামো সহজ করে বাণিজ্য খাতকে আরও উন্মুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের বিকাশ, বিনিয়োগ বোর্ড ও বেসরকারীকরণ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে তাঁর সরকারের সবচেয়ে সাহসী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ২০০৩ সালে মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

সামাজিক পরিবর্তন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন

অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক খাতেও খালেদা জিয়ার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রথম মেয়াদেই দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। পাশাপাশি ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি এবং মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি চালু করায় স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

এ ছাড়া কৃষি খাতে এনজিওগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উন্নত বীজ ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁর শাসনামলেই।

সাফল্যের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যতের ভিত্তি

অর্থনীতিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকের শেষ দিকে যেখানে দেশের প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশের নিচে ছিল, খালেদা জিয়ার আমলে তা ৫ শতাংশের বেশি হয়। একই সময়ে দারিদ্র্যের হার ৫৬ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে আসে। আদমজী জুট মিলের মতো দীর্ঘদিনের লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা এবং টেলিযোগাযোগ খাত উন্মুক্ত করার মতো কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তও তাঁর সরকার গ্রহণ করে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “স্বৈরশাসনের পর যখন দেশের সম্পদ সীমিত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল, তখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়।”

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতিও বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের অন্যতম ‘স্থপতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সংগঠনটির মতে, তাঁর শাসনামলে গৃহীত সংস্কারমূলক সিদ্ধান্তগুলোই আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত গড়ে দিয়েছে।

Share
নিউজটি ৩৭ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged