শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়াতে ১০ হাজার কোটি টাকার ইকুইটি ফান্ডের সুপারিশ

সময়: সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫ ১১:১৮:০২ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে স্থবিরতা কাটিয়ে গতি ফেরাতে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ ইকুইটি তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪ শতাংশ ভর্তুকিযুক্ত সুদে মার্জিন ঋণ সুবিধা দিতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বর্তমান প্রায় ২০ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ৬০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে একাধিক কর প্রণোদনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে এক লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয় করমুক্ত রাখার সুপারিশ উল্লেখযোগ্য।

অন্যান্য করসংক্রান্ত প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে— ক্যাপিটাল গেইনের ওপর করহার কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ, সম্পদ-সমর্থিত সিকিউরিটিজে ২০ শতাংশ কর ছাড় প্রদান এবং মিউচুয়াল ফান্ডের কর অবকাশের মেয়াদ বৃদ্ধি।

প্রতিবেদনটিতে শেয়ারবাজারের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) পুনর্গঠন এবং স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এই সুপারিশসমূহ সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম সাদিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাজার উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বিএসইসির কমিশনার ফারজানা লালারুখ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব।

তবে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ সিদ্দিকী মনে করেন, শেয়ারবাজারের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে মূলত দেশের অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং গত দুই বছরে নতুন বিনিয়োগের ঘাটতি দায়ী। তার মতে, স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার ছাড়া বড় তহবিল গঠন বাজারে টেকসই আস্থা ফেরাতে সহায়ক হবে না।

তহবিল ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সহায়তা

প্রস্তাবিত ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিলটি শুধুমাত্র শেয়ারে বিনিয়োগ করা হবে এবং এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে আইসিবির হাতে। পেশাদার পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের মাধ্যমে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং তদারকির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, আইসিবি ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইসিবির পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে রাইট শেয়ার ইস্যুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বিদ্যমান ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল আরও ২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে তারা ৪ শতাংশ ভর্তুকিযুক্ত সুদে মার্জিন ঋণ নিতে পারেন। তবে আইসিবির অতীত পারফরম্যান্স মূল্যায়নের পরই নতুন তহবিল হস্তান্তরের পক্ষে মত দিয়েছেন ফারুক আহমদ সিদ্দিকী।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও বাজার সংস্কার

প্রতিবেদনে স্টক ডিলার, মার্কেট মেকার, পোর্টফোলিও ও অ্যাসেট ম্যানেজারসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। লক্ষ্য হিসেবে ১২ বছরের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের অংশ ৬০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করার বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় মুনাফার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার সুপারিশও করা হয়েছে। পাশাপাশি বিমা কোম্পানির শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বিএসইসি, বিআইসিএম ও বিএএসএমের মাধ্যমে আর্থিক সাক্ষরতা কার্যক্রম জোরদারের কথা বলা হয়েছে।

ফ্লোর প্রাইস, করপোরেট সুশাসন ও ‘জেড’ কোম্পানি

কমিটি বাজারে স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরাতে ফ্লোর প্রাইস সম্পূর্ণ বাতিল এবং আইপিওর পর তালিকাভুক্তির প্রথম দিন থেকেই সব ধরনের লেনদেন বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। বর্তমানে কেবল বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে ফ্লোর প্রাইস কার্যকর রয়েছে।

এছাড়া কোম্পানির ঋণ গ্রহণের সীমা ইকুইটি ক্যাপিটালের ২৫০ শতাংশে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে কোম্পানিগুলো আগ্রহী হয়।

‘জেড’ শ্রেণির কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে অন্তত ৩০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার এবং দুই বছরের মধ্যে উন্নতি না হলে স্বতন্ত্র পরিচালককে চেয়ারম্যান করার প্রস্তাবও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাজার স্থবিরতার কারণ

কমিটি শেয়ারবাজারের মন্দাবস্থার পেছনে আটটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে— দুর্বল মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, উচ্চ সুদের হার, প্রণোদনা প্রত্যাহার, সঞ্চয়পত্রে বেশি মুনাফা, মূল্যস্ফীতি, আস্থার সংকট, ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে কম তহবিল সংগ্রহ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত বাজারে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ৭০–৮০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা মাত্র ২০ শতাংশে সীমাবদ্ধ। উচ্চ সুদের হার ও কর প্রণোদনা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ শেয়ারবাজার থেকে সরে গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

 

Share
নিউজটি ৬১ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged