সুশাসন জোরদারে পরিচালনা কাঠামোয় পরিবর্তন আনছে দুই ব্যাংক

সময়: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ ৬:২৫:১৫ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক খাতে সুশাসন ও পরিচালনা কাঠামো শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রমের পাশাপাশি নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনছে কয়েকটি ব্যাংক। এর ধারাবাহিকতায় পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্ব নির্বাচন এবং চেয়ারম্যান পদকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব কমাতে নতুন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক। একই সময়ে স্বতন্ত্র পরিচালককে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্বে পরিবর্তন এনেছে নতুন প্রজন্মের এসবিএসি ব্যাংক।

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংক খাতে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালকদের যোগ্যতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের একটি কাঠামোও নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর পাশাপাশি এক ডজনের বেশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক ও পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব পদক্ষেপের বাইরে কয়েকটি ব্যাংক নিজেদের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকগুলোর মতে, পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা বা দ্বন্দ্ব তৈরি হলে সেটি ব্যাংকের কার্যক্রম ও ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ অবস্থায় এনসিসি ব্যাংক চেয়ারম্যান নির্বাচনের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমিক দায়িত্ব হস্তান্তর বা রোটেশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির ১২তম বিশেষ সাধারণ সভায় সংঘবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী অক্টোবর থেকে এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত নিয়মে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী শেয়ারধারী পরিচালক পর্যায়ক্রমে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাবেন। অর্থাৎ পরিচালনা পর্ষদের শেয়ারধারী পরিচালকেরা তাঁদের জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে একে একে চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ পাবেন। এর মাধ্যমে চেয়ারম্যান পদকে কেন্দ্র করে পরিচালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

নতুন বিধান অনুযায়ী, বর্তমান চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হলে কিংবা কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে পরবর্তী জ্যেষ্ঠ শেয়ারধারী পরিচালক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য হবেন। কোনো ক্ষেত্রে দুই বা ততোধিক পরিচালকের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ সমান হলে তাঁদের বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে।

তবে কোনো জ্যেষ্ঠ পরিচালক লিখিতভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে তাঁর পরের জ্যেষ্ঠ শেয়ারধারী পরিচালক চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ পাবেন। কোনো পরিচালক নিজের পালাক্রমে চেয়ারম্যান হতে রাজি না হলেও শুধু এ কারণে তাঁর পরিচালক পদে থাকা বাধাগ্রস্ত হবে না। তবে পরবর্তী সময়ে চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ নিতে চাইলে তাঁকে বর্তমান পরিচালকদের ধারাবাহিক মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুন নেওয়াজ সেলিমের ভাষ্য, চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী চেয়ারম্যান হওয়ার আগ্রহকে কেন্দ্র করে পরিচালকদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতি এড়াতেই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চেয়ারম্যান নির্বাচনের পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে পরিচালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে এবং তাঁরা ব্যাংকের কার্যক্রমে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।

অন্যদিকে, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে নিয়োগ দিয়েছে এসবিএসি ব্যাংক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাকছুদুর রহমান সরকারকে এক বছরের জন্য ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়েছে। শেয়ারধারী পরিচালকদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এসবিএসি ব্যাংকের বর্তমান পরিচালকদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। তাঁরা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না। অন্যদিকে, চেয়ারম্যান পদে আগ্রহী কয়েকজনকে নিয়েও পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এসবিএসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাকছুদুর রহমান সরকার বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই শেয়ারধারী পরিচালকেরা তাঁকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের পরিচালনা ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাংকের জন্য নতুন একটি ধারা তৈরির চেষ্টা করা হবে।

এনসিসি ব্যাংকের সংশোধিত ব্যবস্থায় নতুন ও মনোনীত পরিচালকদের ক্ষেত্রেও জ্যেষ্ঠতার বিধান প্রযোজ্য হবে। ভবিষ্যতে কোনো সাবেক পরিচালক আবার পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হলে তাঁকেও নতুন পরিচালক হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কোনো পরিচালক অবসরের বয়সে পৌঁছে গেলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে পুনরায় পরিচালক নির্বাচিত হলে তিনি নির্ধারিত চেয়ারম্যানের মেয়াদ সম্পূর্ণ করতে পারবেন।

এ ছাড়া চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়লে অথবা তাঁর কার্যক্রমের কারণে ব্যাংকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে হলে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যুক্তিসংগত সুযোগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এরপর পরিচালনা পর্ষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে চেয়ারম্যানকে পদ থেকে অপসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে এনসিসি ও এসবিএসি ব্যাংক উভয়ই পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এনসিসি ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচন পদ্ধতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট অনুমোদন এবং পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর।

Share
নিউজটি ০ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged