দখলদার মুক্ত করে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ফিরিয়ে দেয়ার দাবি

সময়: সোমবার, আগস্ট ১৯, ২০২৪ ১১:৪৭:৩২ পূর্বাহ্ণ

বিশেষ প্রতিবেদক: সালমান এফ রহমানের গঠনকৃত বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের দায়িত্ব হস্তান্তর, আত্মসাতকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধার, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদত্যাগ ও বঞ্চিত গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধসহ নয় দফা দাবি জানিয়েছেন কোম্পানিটির চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা কর্মচারী ও ক্ষতিগ্রস্ত বীমা গ্রাহকরা। দুই যুগ ধরে থাকা দখলদার ও লুটেরাদের কবল থেকে এক সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে মুক্ত করতে গতকাল কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানান তারা।

অভিযোগে বলা হয়, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিরা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি দখল নেয়। দখলদাররা পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও নিকটাত্মীয় শেখ কবির হোসেনের পরোক্ষ মদদে ২০০৯ সালের শুরুতে বীমা কোম্পানিটির তোপখানা রোডের প্রধান কার্যালয়ের দখল নেয়। এরপর এক এক করে প্রথমে পর্ষদ চেয়ারম্যান ড. মোকাদ্দেছ হোসেন, পরিচালক নাজনীন হোসেন, হেলাল মিয়া, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী ও ফরিদা ইয়াসমিন, শামসুল হক, হোসনে জাহান ও স্পন্সর পরিচালক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামকে পর্ষদ থেকে বিতাড়িত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে দখলদাররা। এ ছাড়া তিন লাখ গ্রাহকের বীমা স্কিম মেয়াদপূর্তি হলেও তাদের দাবি পরিশোধ করেনি দখলদাররা। এতদিন ভয়ে কেউ মুখ খোলেননি। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে অন্তর্র্বতী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ভুক্তভোগীরা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে পথে নেমেছেন।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার ভুক্তভোগীরা অন্তর্র্বতী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বরাবর দেওয়া পৃথক আবেদনে দখলদারদের হাত থেকে কোম্পানিটি মুক্ত করা ও বিমা দাবির অর্থ চেয়েছেন।

কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, ২০০০ সালে বীমা কেম্পানিটি যাত্রা শুরু করে ২০০৮ সালে মাত্র আট বছরে ওই সময়ের সেরা বীমা কোম্পানিগুলোকে পেছনে ফেলে গ্রাহক সংখ্যা ও বিমার প্রিমিয়াম আয়ে দেশের শীর্ষ বিমা কোম্পানির মর্যাদা পেয়েছিল। ২০০৯ সাল থেকে দখলদারদের হাতে যাওয়ার পর তারা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লুট করে নেয়। বর্তমানে এই কোম্পানির কাঁধে ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। প্রায় তিন লাখ গ্রাহকের বিমা স্কিম মেয়াদ পূর্ণ হলেও তাদের বিমা দাবি পরিশোধ করা হয়নি। ২০২১ সালে শেখ কবির হোসেন নিজে কোম্পানিটির পর্ষদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন।

মানববন্ধনে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অবৈধ। তারা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের প্রতিবাদ করলে অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফের আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের ৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- অন্যায়ভাবে জোরপূর্বক চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল করাসহ সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা। বঞ্চিত গ্রাহকদের মেয়াদপূর্তির টাকা ও মরনোত্তর বীমা দাবি দ্রুত পরিশোধ করা।

পলায়নকারী হাসিনা সরকারের মদদপুষ্ট জবরদখলকারী সালমান এফ রহমানের গঠনকৃত পরিচালনা পর্যদের পদত্যাগ এবং আত্মসাতকৃত হাজার হাজার কোটি টাকা উদ্ধার ও অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে বোর্ড পুনর্গঠন ও দায়িত্ব হস্তান্তর করা।

কোম্পানির হাজার হাজার কোটি টাকা অর্থ আত্মসাতকারীদের আইনের আওতায় এনে অর্থ উদ্ধারসহ তাদের শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার চাচা বর্তমান চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের পদত্যাগসহ কোম্পানি থেকে বহিষ্কার করা।

ভাইস চেয়ারম্যান ড. মো. ইব্রাহিম হোসেন খানের পদত্যাগসহ কোম্পানি থেকে বহিষ্কার করা। দুর্নীতিবাজ ও অনৈতিক কাজের সহযোগী, অদক্ষ, অযোগ্য মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আপেল মাহমুদকে বহিষ্কার করা।

এ ছাড়াও সালমান এফ রহমান ও শেখ কবির হোসেনের নিয়োগকৃত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে চাকরি থেকে বহিস্কার করা।
ফারইস্ট লাইফের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নুরুল্লাহ সিদ্দিকী তার বক্তব্যে বলেন, আমরা ফারইস্ট ইসলামী লাইফের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কর্মরত। ব্যক্তিগত ও সততার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করেছি। অথচ ফারইস্ট লাইফের পরিচালনা পর্ষদের কতিপয় অসাধু পরিচালকের দুর্নীতির কারণে আমরাই আজ চাকরিচ্যুত।

তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ছাত্রছায়ায় তারা আমাদের অবৈধভাবে চাকরিচ্যুত করেছে, যার দোসর বর্তমান সিইও আপেল মাহমুদ। আমরা শত শত কর্মী ও কর্মকর্তা নির্যাতনের শিকার হয়েছি। পরিবার সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। আমরা এর ন্যায় বিচার চাই।

নুরুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, বর্তমান বীমা খাত নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ আমাদের অভিভাবক। আমি দেখেছি, আইডিআরএ’র মাননীয় চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী স্যার বীমা খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এখন সুষ্ঠু তদন্ত করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের দুর্নীতিবাজ ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিবেন। আমাদের সাথে যারা অন্যায় করেছেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
ফারইস্ট লাইফের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের নেত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, আমাদের এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। ফারইস্ট লাইফের কোন ক্ষতি হোক তা আমরা চাই না। আমরা বীমা খাতের উন্নয়নের স্বার্থে এ আন্দোলন করছি। দেশকে এবং ইন্স্যুরেন্সকে শক্তিশালী করতে আজকে আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি।

আইডিআরএ’র দৃষ্ট আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আমরা জানি আইডিআরএ ইতোমধ্যেই বেশ কিছু কোম্পানির বোর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে এবং স্বচ্ছ বোর্ড গঠনে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু আপনারা কেন ফারইস্টের ব্যাপারে সহযোগিতা করছেন না তা আমরা জানি না। আপনারা কেন নীরব আছেন তাও আমরা জানি না।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি- যত দিন যাবে ফারইস্ট ততটাই ধ্বংসের মুখে পড়বে। তাই দুর্নীতিবাজ পর্ষদকে ভেঙ্গে দিয়ে কোম্পানিকে রক্ষা করার জন্য এবং গ্রাহকস্বার্থ রক্ষায় যারা আজকে ফারইস্টকে প্রতিষ্ঠা করেছে সেইসব উদ্যোক্তাদের হাতে ফারইস্টের দায়িত্ব তুলে দিতে আইডিআরএ’র হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

রোকেয়া আরো বলেন, আইডিআরএ’র পাশাপাশি আমরা অর্থ উপদেষ্টারও দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনার আর বসে থাকবেন না। ফারইস্টের গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষায় আপনারা আর চুপ থাকবেন না। আপনারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

তিনি বলেন, বর্তমান বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের সাথে কোন সমঝোতা করব না। তারা যতক্ষণ না পদত্যাগ করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন চলবে। সালমান এফ রহমানের দোসর ড. ইব্রাহিম হোসেনকে তিনি পদত্যাগ করার দাবি জানান। সেই সাথে তাদের অন্যায়ের জন্য শাস্তিরও দাবি জানান রোকেয়া। চাকরিচ্যুত আরেক বীমা কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, আমাদের শত শত বীমা গ্রাহক তাদের দাবির টাকা পাচ্ছে না। আইডিআরএ’র যারা দায়িত্বে আছেন আমরা তাদের বলছি, আমাদের কান্না কি আপনাদের কাছে পৌঁছে নাই। আপনারা আসেন, তদন্ত করেন। বীমা দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা করে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে পদক্ষেপ নেন। সেইসাথে দুর্নীতিবাজ পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

Share
নিউজটি ৪৭৩ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged