চার্জশিট, আদালত ও অনিয়মের মাঝেও বহাল স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি

সময়: বুধবার, জানুয়ারি ২১, ২০২৬ ৮:১০:৩৪ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকিং খাতে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনের চার্জশিট, বিচারাধীন মামলা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসা গুরুতর আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও Standard Bank–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান এখনো নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতি কেবল একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে ঘিরে প্রশ্ন নয়; বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং সুশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। ফলে একজন চার্জশিটভুক্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে বহাল থাকা পুরো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর মো. হাবিবুর রহমানকে পাঠানো এক চিঠিতে সাত কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, Bangladesh Bank–এর পরিদর্শনে যমুনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে তার সংশ্লিষ্টতায় গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে ইউনিয়ন ব্যাংকে তার দায়িত্বকালীন কর্মকাণ্ড ঘিরে। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিক বাংলাদেশ ব্যাংকের বিস্তারিত পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বিতরণে সংঘটিত বড় ধরনের অনিয়মে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৩০টি প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা মোট ২ হাজার ৬৪১ কোটি টাকার ঋণ ক্ষতিজনক বা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ এস আলম–সংশ্লিষ্ট অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইউনিয়ন ব্যাংকের বিনিয়োগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. হাবিবুর রহমান ঋণ অনুমোদনের শর্ত উপেক্ষা করে এবং নিবন্ধিত বন্ধক ছাড়াই ঋণ অনুমোদনের সুপারিশ করেছেন। একাধিক ক্ষেত্রে ভূমি পরিদর্শন প্রতিবেদন, নিবন্ধিত বন্ধকি দলিল, রেজিস্টার্ড পাওয়ার অব অ্যাটর্নি এবং প্রয়োজনীয় খতিয়ান ছাড়াই ঋণ অনুমোদনের নজির পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে এসব কর্মকাণ্ড সিআরএম গাইডলাইন্স–২০১৬-এর সরাসরি লঙ্ঘন। ওই নির্দেশনায় যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, যাচাইকৃত নথিপত্র এবং আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য জামানত ছাড়া কোনো ঋণ অনুমোদন বা সুপারিশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বিষয়টি কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১৪০তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঋণ অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে Anti-Corruption Commission–এ অভিযোগ দায়ের করা হয়। ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৩ জুন ও ১৫ অক্টোবর দুই দফায় অভিযোগ জমা দেন।

এর আগে যমুনা ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে বিসমিল্লাহ গ্রুপের কম্পোজিট টাওয়েল লিমিটেডকে অনিয়মের মাধ্যমে এফডিবিপি বা শিপমেন্ট-পরবর্তী ঋণ সুবিধা অনুমোদনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সে সময় তার এক বছরের ইনক্রিমেন্ট বাতিল এবং এক বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত করা হয়।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও অভিযোগ আরও গুরুতর আকার ধারণ করে। ঋণ অনিয়মের অভিযোগে দুদক তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন এবং তিনি জামিনে রয়েছেন।

এতসব অভিযোগ ও বিচারাধীন মামলা সত্ত্বেও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি পদে তাকে বহাল রাখার ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের বোর্ড সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠালেও বাংলাদেশ ব্যাংক ভিন্ন অবস্থান নেয়।

২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পর্ষদ সভায় উপস্থিত ১১ পরিচালকের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে মো. হাবিবুর রহমানকে ৯০ দিনের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ছয় পরিচালকের স্বাক্ষরিত কার্যবিবরণী বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয় এবং পরিচালকরা বিআরপিডিতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি অবহিত করেন। এমনকি বিষয়টি গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকেও জানানো হয়।

তবে কয়েক দিনের মধ্যেই, ৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বিআরপিডি থেকে পাঠানো এক চিঠিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

এর মধ্যেই মো. হাবিবুর রহমানের তিন বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে থাকায় পুনর্নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি আদালতে গড়ালে ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি High Court Division স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পর্ষদকে পুনর্নিয়োগ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে নির্দেশ দেন। বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন।

এই মামলার মাধ্যমে ব্যাংকের পর্ষদের ভেতরের বিভক্তিও প্রকাশ্যে আসে। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ এবং অন্য পক্ষের নেতৃত্বে তার ছেলে ও ভাইস চেয়ারম্যান একে এম আব্দুল আলীম। আলীমপন্থীদের অভিযোগ, ৭ জানুয়ারির বোর্ড সভা শেষে তারা কার্যালয় ত্যাগ করার পর চেয়ারম্যানপন্থী একটি অংশ পুনরায় সভাকক্ষে প্রবেশ করে হাবিবুর রহমানের নবায়ন প্রস্তাব কার্যবিবরণীতে যুক্ত করে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে জানায়, পর্ষদের ঐকমত্য বা সুপার মেজরিটি ছাড়া এমডির পুনর্নিয়োগ গ্রহণযোগ্য হবে না। পরদিন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, ১০ জন পরিচালকের মধ্যে অন্তত ৯ জন একমত না হলে পুনর্নিয়োগ বিবেচনায় নেওয়া হবে না।

তবে এসব ঘোষণা ও নির্দেশনার পরও মো. হাবিবুর রহমানের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে চার্জশিটভুক্ত একজন ব্যাংকারের পুনর্নিয়োগ প্রচেষ্টা এবং তাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে ব্যাংকিং খাতে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে যেসব বিষয় উঠে এসেছে, সে বিষয়ে তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা নেওয়া হয়েছে এবং তা বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে মো. হাবিবুর রহমান দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তার সুনাম ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যেই এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে।

Share
নিউজটি ৪ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged