নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শিল্পখাতে অতিরিক্ত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শেয়ারবাজারভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণের পরিবর্তে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহে উৎসাহিত করতে নীতিগত কাঠামো প্রণয়ন করা হবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত শেয়ারবাজার বিষয়ক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘শেয়ারবাজারের নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (Capital Market Journalists Forum–CMJF)।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (Bangladesh Securities and Exchange Commission–BSEC)-এর চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (National Board of Revenue–NBR)-এর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। এছাড়া বক্তব্য দেন বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (Dhaka Stock Exchange–DSE)-এর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (Chittagong Stock Exchange–CSE)-এর চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (Bangladesh Association of Publicly Listed Companies–BAPLC)-এর সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (Bangladesh Merchant Bankers Association–BMBA)-এর সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফের সভাপতি মনির হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (DSE Brokers Association of Bangladesh–DBA)-এর সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান এবং অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের শেয়ারবাজারকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণমূলক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ সহজ করতে একটি বিশেষ ‘ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে দেশের শেয়ারবাজারে ইসলামিক ফাইন্যান্স মার্কেট সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বাজারের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অডিট প্রতিষ্ঠান, সম্পদ মূল্যায়নকারী সংস্থা ও ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই অডিট প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন, তাই এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (Financial Reporting Council–FRC) এবং বিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে।
তিনি বলেন, অতীতে দেশের অর্থনীতি মূলত ভোগনির্ভর ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। শুধু ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না।
সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে উন্নীত করা। পাশাপাশি দেশের শেয়ারবাজারকে ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে ‘ইমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য কাঠামোগত সংস্কার, ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন এবং বাজারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের বাজার মূলধন জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশ, যা প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় কম। বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই সরকারের লক্ষ্য।
বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, কমিশন ইতোমধ্যে ১২৬টি তদন্ত সম্পন্ন করেছে এবং এসব ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। তিনি জানান, জরিমানা পরিশোধের জন্য নয় মাস সময় দেওয়া হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়ার কারণে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এনফোর্সমেন্ট বিভাগের মাধ্যমে তিন শতাধিক মামলার নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো ১৬টি মানি লন্ডারিংয়ের মামলা দুর্নীতি দমন কমিশন (Anti-Corruption Commission–ACC)-এ পাঠানো হয়েছে। তদন্তে কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ এবং ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রদর্শনের ঘটনা পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম বন্ধে ব্যাংকের অফিস সফটওয়্যার ব্রোকারেজ হাউসে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ডিএসইর ২৮০টি ব্রোকারেজ হাউসে এ সফটওয়্যার বসানো হয়েছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, দেশে আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত আইন থাকা সত্ত্বেও কেন শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করা সম্ভব হয়নি। তার মতে, বাজার কাঠামোর মধ্যেই কিছু দুর্বলতা রয়েছে।
মূল প্রবন্ধে মনিরুজ্জামান বলেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় বর্তমানে তিনটি বড় সমস্যা রয়েছে— শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট, ব্যাংকিং খাতে চাপ এবং কর আহরণ কম হওয়া। তবে এগুলো আলাদা সমস্যা নয়; বরং সঞ্চয় ও মূলধন বণ্টনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার ফল।
তিনি শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়াতে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং ভালো মানের কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তার মতে, অনেক ভালো কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও তারা শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী নয়, কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো কর ও ভ্যাট যথাযথভাবে পরিশোধ করলেও অনেক অতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান তা এড়িয়ে যায়।
ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছরে সরকার শেয়ারবাজারকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। তবে বর্তমান সরকার এ খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতির সঙ্গে শেয়ারবাজারের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একটি শক্তিশালী বাজার গড়ে তুলতে স্থিতিশীলতা, সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, শেয়ারবাজারের সব পর্যায়ে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। এতে বিভিন্ন স্টেটমেন্ট ও নথি ডিজিটালভাবে জমা দেওয়া সহজ হবে এবং বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে।


