ইসলামী ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিচার চেয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের দাবি গ্রাহক ফোরামের

সময়: শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬ ৫:৩১:৩৩ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধের দাবি জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বর্তমান চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে ব্যাংকিং খাতে দক্ষ, সৎ ও পেশাদার ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি তুলে ধরেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নূরনবী মানিক।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অসত্য দাবি
সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেছেন। এসব বক্তব্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং অনেকে আমানত তুলে নিচ্ছেন।

নূরনবী মানিক বলেন, ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি প্রায় তিন কোটি গ্রাহকের আস্থা ও দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রেমিট্যান্স প্রবাহ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের সঙ্গে ব্যাংকটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল ব্যাংক
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। গ্রাহকদের আস্থা ফিরছিল, আমানত বাড়ছিল এবং ব্যাংকটি আর্থিক স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু সম্প্রতি চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পরিবর্তন এবং নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে আবারও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

২০১৭ সালে জোরপূর্বক মালিকানা পরিবর্তনের অভিযোগ
সংগঠনটির দাবি, ২০১৭ সালে জোরপূর্বক মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক দখল করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

আরডিএস প্রকল্প নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে নূরনবী মানিক বলেন, ইসলামী ব্যাংকের রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম (আরডিএস) নিয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা ব্যাংকের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালে আরডিএসের বিনিয়োগ ছিল ৬ হাজার ৭১২ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকায়। ফলে ২২ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আরডিএস প্রকল্পের খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্র ২৩২ কোটি টাকা এবং ঋণ আদায়ের হার ৯৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আদায় হার বজায় রেখে প্রকল্পটি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করেন তারা।

পুরো ব্যাংকিং খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
গ্রাহক ফোরামের নেতারা বলেন, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হলে শুধু একটি ব্যাংক নয়, পুরো ব্যাংকিং খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতি নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।

সাত দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলন থেকে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. বর্তমান চেয়ারম্যানকে অপসারণ
২. ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া
৩. ব্যাংক লুটেরাদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন
৪. ইসলামী ব্যাংকগুলোকে ঘিরে আতঙ্ক সৃষ্টির প্রচেষ্টা বন্ধ
৫. বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা
৬. ব্যাংক লুটেরাদের পুনর্বাসনের সুযোগ বন্ধ
৭. ইসলামী ব্যাংক বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার

অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা
দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ১৪ জুন ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি এবং ১৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করে সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের শতাধিক সদস্য ও গ্রাহক উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি পুরো ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের উচিত দ্রুত সমাধানে উদ্যোগী হওয়া, নচেৎ আমানতকারীদের আস্থা আরও ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

Share
নিউজটি ৫ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged