আইপিও বিধিমালা পর্যালোচনা শুরু আগামী সপ্তাহ থেকে, বিদেশি বিনিয়োগে জটিলতা কমানোর উদ্যোগ

সময়: বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬ ১১:৩০:৪৮ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতের বর্তমান পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত আর্থিক প্রতিবেদন চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। একই সঙ্গে আইপিও প্রক্রিয়া সহজীকরণ, কাগজনির্ভর কার্যক্রম কমিয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) আয়োজিত পরিচিতি ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।

বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে পূর্ণাঙ্গ ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। তবে আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-৩৪ অনুসরণ করে সংক্ষিপ্ত আর্থিক প্রতিবেদন চালুর কথা জানান তিনি। মাসুদ খান বলেন, ‘আমরা আর পূর্ণাঙ্গ তিন মাসের রিপোর্ট চাইবো না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কনডেন্সড রিপোর্টিং চাই।’

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, দেশে অনেক ভালো প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে আসতে চায় না। কারণ আইপিও প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহ থেকেই আইপিও বিধিমালা পর্যালোচনার কাজ শুরু হবে। এ জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সঙ্গে যৌথ বৈঠক করবে কমিশন।

মাসুদ খান বলেন, বিএসইসির কার্যক্রম এখনো অনেকাংশে কাগজনির্ভর। যোগদানের প্রথম দিনেই তিনি অসংখ্য ফাইল দেখে বিস্মিত হয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ যখন আমার কাছে আসে, সে তার সমস্যার বর্ণনা শুনতে চায় না; সে সমাধান চায়। তাই আমি কমিশনের সবাইকে বলেছি, আমাদের ‘সল্যুশন মাইন্ডসেট’ নিয়ে কাজ করতে হবে।’

তিনি জানান, কমিশনের সব রেগুলেটরি রিপোর্টিং ধীরে ধীরে ডিজিটাল করা হবে। এক্সবিআরএল, এক্সএমএলভিত্তিক রিপোর্টিং এবং ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করে তথ্য বিশ্লেষণও স্বয়ংক্রিয় করা হবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, এখনো অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের স্বাক্ষরের অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সমস্যা দূর করতে ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি ব্রোকারদের উদ্দেশে বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে আমাদের এগোতেই হবে।’

টি+১ সেটেলমেন্ট চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, এটি সময়ের দাবি। তবে শর্ট সেলিং বা স্ক্রিপ্ট নেটিংয়ের মতো বিষয়গুলোতে বাজারের পরিপক্বতা বিবেচনা করে এগোতে হবে।

আইপিও অনুমোদন, সার্ভেইলেন্স ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক বিষয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কমিশন সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। যেসব দায়িত্ব স্টক এক্সচেঞ্জের, সেগুলো তাদেরই পালন করতে হবে।

মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর। দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে শক্তিশালী করতে মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। তিনি জানান, সিকিউরিটিজ ট্রাইব্যুনালকে কার্যকর করা এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত আদালত গঠনের বিষয়েও কমিশন কাজ করছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে বিনিয়োগ করলেও মুনাফা বা মূলধন ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতার মুখে পড়েন বলে মন্তব্য করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, মূলধনী মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইন) কর নির্ধারণের বর্তমান পদ্ধতি জটিল। এ বিষয়ে সহজ ও বাস্তবসম্মত সমাধান বের করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে কাজ করা হবে।

মাসুদ খান বলেন, দেশের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আর্থিক জ্ঞান এখনো সীমিত। অনেক বিনিয়োগকারী সিডিবিএলের এসএমএসও গুরুত্ব দিয়ে পড়েন না। তিনি বলেন, বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা বাড়ানো জরুরি।

ডিবিএর এমন আয়োজন নিয়মিত হওয়া উচিত উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ছয় মাস বা এক বছর পর আবার ডাকবেন। তখন আমরা এসে বলবো—কী বলেছিলাম, আর কী করেছি। আমি এই জবাবদিহি চাই।’

ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার নাহিদ মাহতাব, তানভীর হাবিব রহমান ও নাফিজ আল তারিক, ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার প্রমুখ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজার সংস্কারে বিএসইসি চেয়ারম্যানের এই ঘোষণাগুলো সময়োপযোগী। ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন সংক্ষিপ্ত করা, আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করা ও ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়িত হলে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তবে ঘোষিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের গতিই এখন প্রধান প্রত্যাশা।

Share
নিউজটি ৪ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged