নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে সরকারি কোম্পানির সংখ্যা বাড়িয়ে বাজারের গভীরতা এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। তবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সরকারি ও সরকার-নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ আর্থিক চিত্রে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে সরকারি কোম্পানি রয়েছে ২০টি। এর মধ্যে সর্বশেষ প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী ১২টি কোম্পানি বা ৬০ শতাংশ লোকসানে রয়েছে।
লোকসানে থাকা ১২টি কোম্পানির কোনোটি সর্বশেষ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দেয়নি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত রিটার্ন পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
সরকারি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার অন্যতম লক্ষ্য হলো ভালো ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানকে বাজারে এনে মানসম্মত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো। তবে তালিকাভুক্ত সরকারি কোম্পানিগুলোর আর্থিক কার্যক্রমে একদিকে যেমন বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করার পাশাপাশি ডিভিডেন্ড দিয়ে ইতিবাচক উদাহরণও তৈরি করছে।
মুনাফা ও ডিভিডেন্ডে এগিয়ে কয়েকটি কোম্পানি
সরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল ও পদ্মা অয়েল নিয়মিত মুনাফা করার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ডিভিডেন্ড দিয়ে আসছে।
সর্বশেষ অর্থবছরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শেয়ারপ্রতি মুনাফা বা ইপিএস হয়েছে ৬১ টাকা ৩৯ পয়সা। কোম্পানিটি ২০০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ২০৬ টাকা ৩০ পয়সা।
একই সময়ে যমুনা অয়েলের ইপিএস ছিল ৫৮ টাকা ৭০ পয়সা। কোম্পানিটি ১৮০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর যমুনা অয়েলের শেয়ারদর ছিল ১৭৬ টাকা ৩০ পয়সা।
সরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে ভালো আর্থিক কার্যক্রম করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে পদ্মা অয়েলও। সর্বশেষ অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৫৭ টাকা ৩০ পয়সা। এ সময় কোম্পানিটি ১৬০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর পদ্মা অয়েলের শেয়ারদর ছিল ১৯৩ টাকা ৮০ পয়সা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ইপিএস হয়েছে ২০ টাকা ১০ পয়সা এবং ডিভিডেন্ড ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলের ইপিএস ১১ টাকা ১ পয়সা এবং ডিভিডেন্ড ৪০ শতাংশ। ন্যাশনাল টিউবসও ১ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে।
বড় লোকসানে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান
অন্যদিকে সরকারি কোম্পানিগুলোর বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মধ্যে রয়েছে। জিলবাংলা সুগার মিলস, শ্যামপুর সুগার মিলস, উসমানিয়া গ্লাস, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর, বিডি সার্ভিসেস এবং ন্যাশনাল টি-এর আর্থিক অবস্থা বিশেষভাবে দুর্বল।
এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়েও নিরীক্ষকদের পক্ষ থেকে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি আর্থিক সহায়তা ছাড়া ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
লোকসানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চাপ দেখা যাচ্ছে জিলবাংলা সুগার মিলস এবং ন্যাশনাল টি-এর ওপর। সর্বশেষ অর্থবছরে জিলবাংলা সুগার মিলসের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৭৮ টাকা ৮৭ পয়সা। ন্যাশনাল টি-এর শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১০৭ টাকা ৪৯ পয়সা। আর শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৫০ টাকা ৭৭ পয়সা।
সর্বশেষ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠান কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি।
আরও যেসব কোম্পানি লোকসানে
এ ছাড়া পাওয়ার গ্রিডের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২ টাকা ৩০ পয়সা। ডেসকোর লোকসান হয়েছে ৩ টাকা ১৫ পয়সা, ইস্টার্ন কেবলসের ৪ টাকা ৪৩ পয়সা, উসমানিয়া গ্লাসের ৫ টাকা ৩৪ পয়সা, রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের ৭ টাকা ৭৬ পয়সা, তিতাস গ্যাসের ৭ টাকা ৮০ পয়সা এবং বিডি সার্ভিসেসের ৮ টাকা ৯৪ পয়সা।
অন্যদিকে আইসিবির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৪ টাকা।
দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন ডিএসই পরিচালক
ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমনের মতে, সরকারি কোম্পানিগুলোর লোকসানের অন্যতম কারণ হলো দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে বছরের পর বছর সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মিনহাজ মান্নান ইমনের মতে, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার আগে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন।
শুধু সরকারি কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে লাভজনক ও দক্ষভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বাছাই করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং দুর্বল কোম্পানিগুলোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এতে বিনিয়োগঝুঁকিও কমার সুযোগ তৈরি হবে।


