নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য করা, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা এবং আর্থিক সেবার পরিধি বিস্তারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ পরামর্শ পৌঁছে দিতে এআই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার নাফিজ আল তারিক।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর ঢাকা শেরাটন হোটেলের অ্যারিয়েল হলে লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজ পিএলসি ও মার্কোপোলো এআইয়ের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিএসইসি কমিশনার নাফিজ আল তারিক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম, লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজ পিএলসির চেয়ারম্যান মাহবুবুল আনাম এবং মার্কোপোলো এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাসফিয়া তাসবিন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরীসহ পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে ‘এন্ড-টু-এন্ড ইনভেস্টমেন্ট জার্নি—পাওয়ার্ড বাই এআই’ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগসেবা বিস্তারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এই অংশীদারত্বের আওতায় এআইভিত্তিক বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করা, বিনিয়োগকারীদের তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা এবং শেয়ারবাজারকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নাফিজ আল তারিক বলেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা এবং আর্থিক সেবা গ্রহণের চাহিদায় দ্রুত পরিবর্তন আসছে। নিজের স্কুলজীবনের একটি ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, একবার তাঁর মা তাঁকে সোনালী ব্যাংকে ৫০০ টাকা জমা দিতে পাঠিয়েছিলেন। ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় তখন তাঁকে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছিল। ওই অভিজ্ঞতার পর ব্যাংকের শাখায় গিয়ে সেবা নেওয়ার বিষয়ে তাঁর মধ্যে একধরনের অনীহা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, শুধু বর্তমানের জেনারেশন জেড নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জেনারেশন আলফার চাহিদার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। নতুন প্রজন্ম ডিজিটাল প্রযুক্তি ও মোবাইল ফোন ব্যবহারে অভ্যস্ত। ফলে তাদের কাছে শেয়ারবাজারের তথ্য, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং আর্থিক পরামর্শ সহজভাবে পৌঁছে দিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
বিএসইসি কমিশনার আরও বলেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় আর্থিক পরামর্শসেবা মূলত বেশি আয় ও বড় অঙ্কের মূলধন রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের কাছে তুলনামূলক সহজে পৌঁছায়। বিপরীতে, যাঁরা প্রতি মাসে অল্প পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করেন, তাঁদের পক্ষে ব্যক্তিগত আর্থিক পরামর্শসেবা পাওয়া কঠিন। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও এআইনির্ভর রোবো-অ্যাডভাইজরি সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তাঁর মতে, এআইভিত্তিক রোবো-অ্যাডভাইজরি সেবা চালু হলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দারাও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এর ফলে তথ্যপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতা কমার পাশাপশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগও বিস্তৃত হতে পারে।
লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মার্কোপোলো এআইয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এবং আর্থিক তথ্যভান্ডারের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সমন্বয় করা হবে। এর মাধ্যমে আর্থিক তথ্যকে কার্যকর বিনিয়োগ বিশ্লেষণে রূপান্তর, বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়ন সহজ করা এবং বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও তৈরি ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, তাদের মোট লেনদেনের প্রায় ৬০ শতাংশ ইতোমধ্যে পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এআইনির্ভর সেবা যুক্ত করা হলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগকারীদের সেবাগ্রহণের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা, দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, গত কয়েক বছরে শেয়ারবাজারে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মকে বাজারের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি জানান, ডিএসইর নতুন ওয়েবসাইট তৈরির কাজ চলছে এবং এর দ্বিতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ নতুন ওয়েবসাইটটি চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম শেয়ারবাজারে তথ্যপ্রাপ্তি এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য শুধু আর্থিক বিবরণী সহজলভ্য করাই যথেষ্ট নয়; বিভিন্ন খাতের প্রয়োজনীয় তথ্যও তাঁদের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায় না। এতে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিশ্লেষণ করা এবং যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে তরুণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজবোধ্য তথ্য সরবরাহ এবং আর্থিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান মাহবুবুল আনাম বলেন, শেয়ারবাজারে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ নতুন উদ্যোগগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে বিনিয়োগকারীদের তথ্য বিশ্লেষণ, বিনিয়োগের সম্ভাবনা মূল্যায়ন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার পাশাপাশি গ্রাহকসেবার দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারবাজারে এআইভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারিত হলে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা কমতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজলভ্য, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করা গেলে শেয়ারবাজারে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের অভিজ্ঞতাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।


