মুনাফা থেকে লোকসান, ডিভিডেন্ডও বন্ধ; শার্প ইন্ডাস্ট্রিজে বড় সংকট

সময়: বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২৬ ১০:৫৩:১১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পর বড় ধরনের দরপতন এবং ডিভিডেন্ড না দেওয়ার ঘোষণায় চরম বিপাকে পড়েছেন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিনিয়োগকারীরা। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪২ টাকা ছাড়িয়ে গেলেও পরে তা নেমে এসেছে ১১ টাকার ঘরে। এর সঙ্গে আর্থিক লোকসান, ডিভিডেন্ড বন্ধ এবং ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমনের খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির সময় যারা বেশি দামে শেয়ার কিনেছেন, দরপতনে তাদের বড় ধরনের মূলধনি লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিটি শেয়ারের বাজারদর ছিল ১৫ টাকা। এরপর উল্লেখযোগ্য কোনো মৌলিক বা ব্যবসায়িক পরিবর্তনের তথ্য ছাড়াই শেয়ারটির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। মাত্র দুই মাসের মধ্যে, গত ১২ আগস্ট প্রতিটি শেয়ারের দর বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ টাকা ১০ পয়সায়।

কোম্পানিটির শেয়ারদরে এমন অস্বাভাবিক উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে। বিষয়টি নজরে আসার পর শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তদন্তের উদ্যোগ নেয়। শেয়ারটির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পেছনে কোনো চক্র বা কারসাজি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেয় সংস্থাটি।

তদন্তের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শেয়ারটির দরে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে দরপতন অব্যাহত থাকায় শেয়ারটির দাম আর আগের অবস্থানে ফিরতে পারেনি। এতে বেশি দামে শেয়ার কেনা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। অন্যদিকে, বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির সময়ে সুবিধাজনক দামে শেয়ার বিক্রি করে কেউ কেউ বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকতে পারেন।

এরপর কোম্পানিটির ডিভিডেন্ড না দেওয়ার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও নেতিবাচক করে তোলে। গত সোমবার ১৯ অক্টোবর লেনদেন শেষে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর নেমে আসে ১১ টাকা ২০ পয়সায়। অর্থাৎ, গত ১২ আগস্টের ৪২ টাকা ১০ পয়সার সর্বোচ্চ দরের তুলনায় শেয়ারটির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এমনকি গত ১৫ জুনের ১৫ টাকার দরকেও ছাড়িয়ে নিচে নেমে গেছে শেয়ারটি। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগমূল্য বড় অঙ্কে কমে গেছে।

ডিভিডেন্ড না দেওয়ায় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামছে
টানা দুই বছর ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) শার্প ইন্ডাস্ট্রিজকে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে নিম্নমানের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত খবরের প্রভাবে গত সোমবার ১৯ অক্টোবর এক দিনেই কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ।

ডিভিডেন্ডসংক্রান্ত করপোরেট ঘোষণার কারণে ওই দিন শেয়ারটির দর পরিবর্তনে সার্কিট ব্রেকারের সীমা কার্যকর ছিল না। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। দিনটিতে কোম্পানিটির প্রায় ৯০ লাখ ৯০ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এসব শেয়ারের মোট লেনদেনমূল্য ছিল ১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালনা পর্ষদ। এ সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য আগামী ২৪ ডিসেম্বর বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আহ্বান করা হয়েছে। সভায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণে রেকর্ড ডেট রাখা হয়েছে ১৯ নভেম্বর।

মুনাফা থেকে লোকসানে কোম্পানি
শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীতেও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির অবনতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ২ টাকা ৩৯ পয়সা লোকসান করেছে। অথচ আগের ২০২৫ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ১১ পয়সা মুনাফা হয়েছিল। অর্থাৎ, আগের বছরের মুনাফার অবস্থান থেকে কোম্পানিটি বড় ধরনের লোকসানে চলে গেছে।

লোকসানের প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্যেও। আগের অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ছিল ১০ টাকা ৮ পয়সা, যা কমে ২০২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৭ টাকা ৬৮ পয়সায়।

তবে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগের অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ১ টাকা ৭৪ পয়সা থাকলেও ২০২৬ অর্থবছরে তা ইতিবাচক হয়ে ৫২ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

২৫ অক্টোবর থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে
বিএসইসির বিধান অনুসারে, আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হবে। এতে কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

কোম্পানিটির শেয়ার মালিকানার তথ্য অনুযায়ী, মোট শেয়ারের ৩৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ রয়েছে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় রয়েছে ৩১ দশমিক ৯৭ শতাংশ শেয়ার। বাকি ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পর বড় ধরনের পতন, ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং ক্যাটাগরি অবনমন—সব মিলিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপ বেড়েছে। অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির সময় যারা বেশি দামে শেয়ার কিনেছেন, তাদের লোকসান আরও গভীর হয়েছে। ফলে কোম্পানিটির আর্থিক দুরবস্থা ও শেয়ারদরের পতনের চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরই।

Share
নিউজটি ৩ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged