আইপিও সংকট ও উচ্চ সুদহারে চাপে শেয়ারবাজার

সময়: বুধবার, মে ১৩, ২০২৬ ৪:৪৯:৫৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকার মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে এখন প্রায় প্রতিদিনই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে—বড় মনিটরে লাল সংকেত, সূচকের পতন এবং অধিকাংশ শেয়ারের দর নিম্নমুখী। সকালবেলায় কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও দুপুরের পর বিক্রির চাপ বেড়ে যায়, ফলে দিন শেষে হতাশ মুখে ফিরছেন বিনিয়োগকারীরা।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মিজানুর রহমান পাঁচ বছর আগে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা লাভের আশায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি দরপতনের কারণে তার বিনিয়োগ এখন কমে প্রায় ৩ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী সময় থেকেই বাজারে অস্থিরতা চলছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু সময় উত্থান দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে ধারাবাহিক দরপতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানে রয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামষ্টিক অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদহার বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ডলারের চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আস্থার সংকট। বিনিয়োগকারীরা স্থায়ী ইতিবাচক প্রবণতা দেখতে না পাওয়ায় সামান্য উত্থান হলেই বড় বিনিয়োগকারীরা লাভ তুলে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভালো ও বড় কোম্পানির আইপিও না আসাও বাজারের স্থবিরতার অন্যতম কারণ। প্রায় দুই বছর ধরে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন আইপিও না আসায় নতুন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমে গেছে।

মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান বলেন, শেয়ারবাজার মূলত একটি পণ্যের বাজারের মতো। সেখানে ভালো কোম্পানি না এলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হন না।

তার মতে, বর্তমানে অনেক ছোট মূলধনের ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের দাম জল্পনার ভিত্তিতে বাড়ছে, পরে বড় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিলে বাজার আবার নিম্নমুখী হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যাংক আমানত ও ট্রেজারি বন্ডে উচ্চ সুদহারও শেয়ারবাজারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারের পরিবর্তে নিরাপদ আমানতের দিকে ঝুঁকছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণও কমে গেছে। নতুন শিল্প বিনিয়োগ কম হলে পুঁজিবাজারেও বড় মূলধনের প্রবাহ তৈরি হয় না।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রভাবও দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা চান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আস্থা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে টেকসই গতি ফেরাতে হলে মানসম্পন্ন বড় কোম্পানিকে আইপিওতে আনতে হবে। পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, সুদহার হ্রাস, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং করপোরেট সুশাসন জোরদার করা জরুরি।

তাদের মতে, শুধু সূচকের উত্থান নয়, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনা-ই এখন বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Share
নিউজটি ২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged