নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের পুঁজিবাজারে পরিচালিত মেয়াদি বা ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথায় ইতি টেনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন বিধিমালার আওতায় এখন থেকে কোনো ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ আর বাড়ানো যাবে না। মেয়াদ শেষ হলে কিংবা নির্ধারিত বিশেষ পরিস্থিতিতে ফান্ডটি ওপেন-এন্ডেড ফান্ডে রূপান্তরিত হবে নাকি অবসায়নের মাধ্যমে বন্ধ হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন সংশ্লিষ্ট ইউনিটধারীরা।
এই লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫’-এর গেজেট সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে নতুন বিধিমালা কার্যকর হয়েছে বলে বুধবার (৩ জুন) জানিয়েছে বিএসইসি।
নতুন বিধিমালা কার্যকরের ফলে ২০১৫ সালে জারি করা পূর্ববর্তী নির্দেশনা বাতিল হয়ে গেছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ক্লোজড-এন্ড ফান্ডকে ওপেন-এন্ডেড ফান্ডে রূপান্তর করাকে ফান্ডের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হিসেবে গণ্য করা হবে। এ ধরনের রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনগত বিধান অনুসরণ বাধ্যতামূলক হবে।
রূপান্তর প্রস্তাব ও অনুমোদন প্রক্রিয়া
বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো অ্যাসেট ম্যানেজার স্বেচ্ছায় ফান্ড রূপান্তরের প্রস্তাব উত্থাপন করলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট অ্যাসেট ম্যানেজার ও ট্রাস্টির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হবে। একইসঙ্গে ট্রাস্টিকে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রস্তাবটি ইউনিটধারীদের স্বার্থ রক্ষা করছে। এমন প্রস্তাব ফান্ডের মেয়াদপূর্তির অন্তত ১৫০ দিন আগে উপস্থাপন করতে হবে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের বিধিমালার ৬২(২) ধারায় বর্ণিত বিশেষ পরিস্থিতিতে ট্রাস্টিকে বাধ্যতামূলকভাবে ইউনিটধারীদের বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বান করতে হবে। কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাজারদর এবং নিট সম্পদমূল্য (এনএভি)-এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান বিদ্যমান থাকলে এ বিধান কার্যকর হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের জন্য রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করতে হবে এবং সভার নোটিশ কমপক্ষে ২১ দিন আগে প্রকাশ করতে হবে। রেকর্ড ডেট অনুযায়ী যেসব বিনিয়োগকারীর নামে ইউনিট থাকবে, কেবল তারাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। রূপান্তর প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য মোট ইউনিটের অন্তত ৭৫ শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
ভোটের ফলাফল ও পরবর্তী করণীয়
বিধিমালার ৬২(২) ধারার আওতাধীন কোনো ফান্ডে রূপান্তরের পক্ষে প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়া গেলে ইউনিটধারীদের সিদ্ধান্ত অবসায়নের পক্ষে বলে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে ট্রাস্টিকে বিধিমালা অনুযায়ী ফান্ড লিকুইডেশনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
অন্যদিকে, ৬২(২) ধারার বাইরে থাকা কোনো ফান্ডে রূপান্তর প্রস্তাব অনুমোদন না পেলে ইউনিটের লেনদেন পুনরায় চালু হবে এবং ফান্ডের সম্পদ ও ব্যবস্থাপনা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে।
কেন আনা হলো এই পরিবর্তন
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অধিকাংশ ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রকৃত সম্পদমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে লেনদেন হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফান্ডের ইউনিট বাজারে এনএভির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্টে হাতবদল হয়েছে।
এর ফলে ইউনিটধারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় এবং ফান্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। অতীতে কয়েকটি ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে সেই সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ইউনিটধারীরাই নেবেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নতুন বিধান অনুযায়ী, ফান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইউনিটধারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্ধারিত পরিস্থিতিতে ট্রাস্টিকে বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজন করতে হবে। সেখানে ভোটের মাধ্যমে ইউনিটধারীরা সিদ্ধান্ত নেবেন ফান্ডটি ওপেন-এন্ডেড কাঠামোয় রূপান্তরিত হবে নাকি লিকুইডেশনের মাধ্যমে বন্ধ হবে।
রূপান্তরের পক্ষে মোট ইউনিটের অন্তত ৭৫ শতাংশ ভোট প্রয়োজন হবে। এই সমর্থন অর্জিত না হলে বিধিমালার আওতাভুক্ত বিশেষ ক্ষেত্রে ফান্ড অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ট্রাস্টির কাছে যাবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
রূপান্তর কার্যক্রম শুরু হলে ফান্ডের সম্পদ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ট্রাস্টির কাছে হস্তান্তর করা হবে। কার্যকর তারিখ থেকে ট্রাস্টি ফান্ডের সব সম্পদ, দায়, নগদ অর্থ ও অন্যান্য সম্পদের প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
তবে ট্রাস্টি নতুন কোনো বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তার দায়িত্ব হবে সম্পদের সংরক্ষণ, মূল্যায়ন, অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করা এবং রূপান্তর প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা।
স্বাধীন মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক
ফান্ড রূপান্তরের আগে সম্পদের স্বাধীন মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ জন্য এমন অডিটর নিয়োগ করতে হবে, যার সঙ্গে অ্যাসেট ম্যানেজার, ট্রাস্টি বা কাস্টডিয়ানের কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক থাকবে না।
নিয়োগপ্রাপ্ত অডিটরকে দুটি পৃথক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। একটি হবে অডিট রিপোর্ট এবং অন্যটি ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট। ভ্যালুয়েশন রিপোর্টে প্রতিটি সম্পদের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, অলিকুইড সিকিউরিটিজের মূল্যায়ন এবং প্রকৃত এনএভি উল্লেখ করতে হবে।
নতুন ফান্ড হিসেবে পরিচালনা
কোনো ক্লোজড-এন্ড ফান্ড ওপেন-এন্ডেড ফান্ডে রূপান্তরিত হলে সেটিকে কার্যত নতুন ফান্ড হিসেবে পরিচালনা করতে হবে। এজন্য নতুন প্রসপেক্টাস, ট্রাস্ট ডিড, ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট চুক্তিসহ প্রয়োজনীয় সব আইনগত দলিল কমিশনের কাছে দাখিল করতে হবে।
তবে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় কিছু নিয়ন্ত্রক ছাড় রাখা হয়েছে। নতুন করে স্পন্সরদের ন্যূনতম সাবস্ক্রিপশন বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ইউনিটধারীদেরই প্রাথমিক বিনিয়োগকারী হিসেবে গণ্য করা হবে।
ব্যয়ের ওপর নির্ধারণ করা হয়েছে সীমা
রূপান্তর প্রক্রিয়ার নামে অতিরিক্ত ব্যয় চাপিয়ে ইউনিটধারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করে দিয়েছে বিএসইসি।
বিধিমালা অনুযায়ী, মোট রূপান্তর ব্যয় ফান্ডের আকারের ১ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। অ্যাসেট ম্যানেজারের রূপান্তর-সংক্রান্ত ফি সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ট্রাস্টির ফি সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিধিমালার ফলে ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর দীর্ঘদিনের ডিসকাউন্ট সমস্যা অনেকাংশে কমে আসতে পারে। ওপেন-এন্ডেড ফান্ডে রূপান্তরের পর বিনিয়োগকারীরা এনএভি-ভিত্তিক দামে ইউনিট ক্রয় ও রিডেম্পশনের সুযোগ পাবেন। ফলে বাজারদর এবং প্রকৃত সম্পদমূল্যের মধ্যকার ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল পারফরম্যান্স করা কিংবা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ ফান্ডগুলোর জন্য সুশৃঙ্খলভাবে অবসায়নের পথও উন্মুক্ত থাকবে। ফলে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং ইউনিটধারীদের অধিকার সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


