তারল্য সংকট কাটাতে ন্যাশনাল ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১১ নির্দেশনা

সময়: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬ ৫:৫১:২০ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র তারল্য সংকটে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অবশেষে গ্রাহকদের জমা টাকা ফেরত দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ গ্যারান্টির ভিত্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংকটি স্বাভাবিক লেনদেনে ফিরেছে। তবে এই বিশেষ তহবিলের অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১১টি কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। এসব নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো— ব্যাংকের বর্তমান বা সাবেক পরিচালকদের আমানত পরিশোধ এবং নতুন ঋণ বিতরণে এই অর্থ ব্যবহার না করা নিশ্চিত করা।

গত ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটি দৈনন্দিন কার্যক্রম শুরু করার পাশাপাশি আটকে থাকা আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে শুরু করেছে। প্রথম আলো ইংলিশের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার আমানতকারী ২০ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংকে আবেদন জমা দিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর বিধিনিষেধ

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, এই বিশেষ ঋণ তহবিল থেকে কোনোভাবেই ব্যাংকের বর্তমান বা সাবেক পরিচালকদের আমানতের টাকা দেওয়া যাবে না। এমনকি পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বা নতুন বিনিয়োগ দেওয়াও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শর্তাবলিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই তহবিল দিয়ে নতুন ঋণ অনুমোদন, আগের ঋণের সীমা বৃদ্ধি বা অনুমোদিত ঋণের অবশিষ্ট অংশ ছাড়া যাবে না। একই সঙ্গে অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ বা বিনিয়োগ কেনা এবং আন্তব্যাংক দায় পরিশোধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া লভ্যাংশ প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে এবং ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় কোনোভাবেই ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না। এমনকি তহবিলের টাকা পরিচালন খরচ মেটাতেও ব্যবহার করা যাবে না। এই অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে সাপ্তাহিক প্রতিবেদন নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে ন্যাশনাল ব্যাংককে।

সোনালী ব্যাংকের ৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ

ব্যাংকটির দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখা এবং আমানতকারীদের টাকা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে শতভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টিতে ৩ মাসের জন্য ১০ শতাংশ সুদে ৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। এর আগে ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে গ্রাহকদের আস্থা রক্ষা এবং পাওনা পরিশোধের বিষয়টি প্রাধান্য পায়।

টাকা উত্তোলনে অগ্রাধিকার ও পদ্ধতি

বর্তমানে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবধারী যেসব সাধারণ গ্রাহক আগে টাকা তোলার আবেদন করেছিলেন, ন্যাশনাল ব্যাংক প্রথম ধাপে তাদের পাওনা পরিশোধে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দেওয়া হবে।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবু জাফর জানান, গ্রাহকদের বাস্তব চাহিদা বিবেচনা করে অর্থ দেওয়া হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদ ও নেতৃত্বে রদবদলের পর টাকা তোলার হিড়িক কিছুটা কমেছে এবং একই সঙ্গে ব্যাংকিং মাধ্যমে আমদানি কার্যক্রমও আবার গতি পেতে শুরু করেছে। তবে আবেদনে উল্লেখিত পুরো অর্থ সবাই একসঙ্গে পাবেন এমন নয়; শাখাগুলোর দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয়ভাবে টাকা সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি নির্ভর করছে ব্যাংকটির সার্বিক তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর।

যে কারণে সংকটে ন্যাশনাল ব্যাংক

দেশের অন্যতম প্রাচীন এই বেসরকারি ব্যাংকটি গত কয়েক বছর ধরে আর্থিক জালিয়াতি, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকটে ভুগছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটি ২,২৮৬ কোটি টাকা লোকসান গণনা করেছে। রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও মূলধনের চরম ঘাটতি ব্যাংকের স্থায়িত্বকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তাৎক্ষণিক সহায়তা সাধারণ গ্রাহকদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ন্যাশনাল ব্যাংককে টিকে থাকতে হলে খেলাপি ঋণ আদায়, আর্থিক খাত ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ফেরানোর বিকল্প নেই। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকদের ক্ষুণ্ন হওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ১১টি শর্তের কঠোর প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংক কতটা দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Share
নিউজটি ২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged