নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ ২৬ মাসের নেতৃত্বশূন্যতা কাটিয়ে ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ) কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সাত সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন গভর্নেন্স বোর্ড গঠন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই বোর্ডের নেতৃত্বে থাকবেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। একই সঙ্গে ফান্ডটির কার্যক্রম বিদ্যমান বিধিমালার পরিবর্তে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ আইনের আওতায় পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার এবং অলিখিত অর্থ ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে ২০২১ সালে সিএমএসএফ গঠন করা হয়। বর্তমানে এই ফান্ডের অধীনে আনুমানিক ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা নগদ অর্থ এবং ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ শেয়ার রয়েছে। ২০২৪ সালে আগের বোর্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় ফান্ডটি কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় ছিল।
বিএসইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন, ২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ড ফান্ডটির যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এর মাধ্যমে ফান্ডের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন বিএসইসির কমিশনার হোসেন সাদাত, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে মনোনীত একজন অতিরিক্ত সচিব, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) প্রেসিডেন্ট সাব্বির আহমেদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) প্রেসিডেন্ট রিয়াদ মাহমুদ এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার।
এ ছাড়া সিএমএসএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বোর্ডের সদস্য হিসেবে থাকবেন এবং সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
ব্যাংক থেকে অবণ্টিত ও অলিখিত লভ্যাংশের অর্থ সিএমএসএফে স্থানান্তরের আইনি ভিত্তি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করার পর ফান্ডটির আইনগত কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিএসইসি যৌথভাবে পর্যালোচনা করে।
প্রাথমিক আলোচনায় ফান্ডটি বিলুপ্ত করে এর অর্থ সরকারি কোষাগারে স্থানান্তরের প্রস্তাবও উঠে এসেছিল। তবে বিএসইসি অর্থগুলো কেবল বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও সুরক্ষার কাজে ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নেয়। এর ধারাবাহিকতায় শুধু বিধিমালার ভিত্তিতে ফান্ড পরিচালনার পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত আইনে সিএমএসএফের আওতা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ ও রাইট শেয়ারের পাশাপাশি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও এবং যোগ্য বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাব বা কিউআইওর (কিউআইও) বিপরীতে ফেরত না দেওয়া সাবস্ক্রিপশনের অর্থও এই ফান্ডের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া তালিকাচ্যুত কোম্পানির অবণ্টিত সম্পদ, বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা, সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান এবং অনুমোদিত অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ ফান্ডে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিএমএসএফের প্রধান উদ্দেশ্য হবে এসব সম্পদের হেফাজতকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং প্রকৃত দাবিদারদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে নগদ লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার, আইপিও ও রাইট শেয়ারের অর্থ। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যেকোনো বিনিয়োগকারী বা তাঁর আইনগত উত্তরাধিকারী যেকোনো সময় পাওনা অর্থ দাবি করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে দাবির জন্য কোনো সময়সীমা বা মেয়াদ নির্ধারিত থাকবে না।
প্রস্তাবিত আইনে লভ্যাংশ বিতরণ ও উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ফান্ডের অর্থ ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হবে।
বর্তমানে সিএমএসএফ বিধিমালা, ২০২১ অনুযায়ী, ফান্ডের নগদ অর্থের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচায় ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া অন্তত ৫০ শতাংশ অর্থ মার্জিন ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনঃঅর্থায়ন ঋণ হিসেবে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
অবশিষ্ট ১০ শতাংশ অর্থ স্থায়ী আমানত বা এফডিআর, সরকারি সিকিউরিটিজ এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করার নিয়ম রয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন আইন কার্যকর হলে ফান্ডটির পরিচালনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগকারীদের পাওনা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত আইনি কাঠামোর আওতায় আসবে বলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।


