নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ বা মার্জিন ফাইন্যান্সিং কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল, ঝুঁকিনিয়ন্ত্রিত এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষাবান্ধব করতে বিদ্যমান বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর সংশোধিত খসড়া প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
খসড়া বিধিমালায় মার্জিন অর্থায়নের সংজ্ঞা, কারা মার্জিন ঋণ দিতে পারবে, গ্রাহকের ন্যূনতম বিনিয়োগ, মার্জিনের সীমা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মার্জিন কল, বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি, মার্জিনযোগ্য শেয়ার নির্বাচন, একক শেয়ারে বিনিয়োগের সীমাসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন বিধান সংযোজন ও সংশোধনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি হলো—কোনো বিনিয়োগকারীর ইক্যুইটি যদি মার্জিন ঋণের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই হিসাবের প্রয়োজনীয় সংখ্যক শেয়ার বিক্রি করতে পারবে।
খসড়া বিধিমালার ওপর অংশীজন, বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামত, পরামর্শ এবং আপত্তি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কমিশনের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএসইসি। কমিশন জানিয়েছে, প্রাপ্ত মতামত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জনের পর বিধিমালার চূড়ান্ত সংস্করণ প্রস্তুত করা হবে। পরে সরকারি গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে এটি কার্যকর করা হবে।
একই সঙ্গে বিএসইসি স্পষ্ট করেছে, বর্তমানে প্রকাশিত নথিটি কেবল একটি খসড়া প্রস্তাব। এটি কোনো চূড়ান্ত সংশোধনী নয়। তাই এ খসড়া নিয়ে অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যা, অপপ্রচার বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
মার্জিন অর্থায়নের নতুন সংজ্ঞা
খসড়া অনুযায়ী, গ্রাহকের মার্জিন হিসাবে জমা রাখা মার্জিনের বিপরীতে সিকিউরিটি কেনার জন্য মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান যে অর্থ প্রদান করবে এবং ওই অর্থের ওপর অর্জিত সুদ বা মুনাফাকে মার্জিন অর্থায়ন হিসেবে গণ্য করা হবে। শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়নের ক্ষেত্রে ‘মুনাফা’ বলতে শরিয়াহসম্মত লাভকে বোঝানো হয়েছে।
একই সঙ্গে কমিশনের নিবন্ধিত বাজার মধ্যস্থতাকারীদের ‘মার্জিন অর্থায়নকারী’ হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
কারা মার্জিন ঋণ দিতে পারবে
সংশোধিত খসড়া অনুযায়ী, কমিশনে নিবন্ধিত স্টক ব্রোকার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার এবং পূর্ণাঙ্গ সেবাদানকারী মার্চেন্ট ব্যাংকার মার্জিন অর্থায়ন দিতে পারবে। তবে যে সম্পদ ব্যবস্থাপক (অ্যাসেট ম্যানেজার) শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানগত ফান্ড পরিচালনা করে, তাকে মার্জিন অর্থায়নকারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
পৃথক ব্যাংক হিসাব বাধ্যতামূলক
মার্জিন অর্থায়ন পরিচালনার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নামে পৃথক ব্যাংক হিসাব রাখতে হবে। এ হিসাব শুধুমাত্র মার্জিন অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট হিসাব নিষ্পত্তির কাজে ব্যবহার করা যাবে। কোনো শাখা বা ডিজিটাল বুথের নামে এ ধরনের হিসাব খোলা যাবে না। বর্তমানে এ ধরনের হিসাব থাকলে বিধিমালা কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া তা পরিচালনা করা যাবে না।
একজন গ্রাহকের একটি ক্যাশ ও একটি মার্জিন হিসাব
একই মার্জিন অর্থায়নকারীর কাছে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ একটি নগদ (ক্যাশ) হিসাব এবং একটি মার্জিন হিসাব পরিচালনা করতে পারবেন।
মার্জিন চুক্তির মেয়াদ এক বছর
খসড়ায় মার্জিন চুক্তির মেয়াদ এক বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল না করলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে। এছাড়া গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিজস্ব নীতিমালার আওতায় প্রতিষ্ঠান মার্জিন অর্থায়ন দিতে পারবে।
ইক্যুইটির বেশি ঋণ দেওয়া যাবে না
কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের ইক্যুইটির চেয়ে বেশি মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ গ্রাহকের ইক্যুইটি ও মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাত হবে ১:১।
অন্যদিকে তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে এ অনুপাত সর্বোচ্চ ১:০.২৫ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া মার্জিন অর্থায়নের অর্থ কেবল মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটি কেনার জন্য ব্যবহার করা যাবে।
মূলধনের পাঁচ গুণ পর্যন্ত মার্জিন ঋণ
কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার প্রকৃত মূলধন (কোর ক্যাপিটাল) অথবা নিট সম্পদের (যেটি বেশি) পাঁচ গুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক
প্রত্যেক মার্জিন অর্থায়নকারীকে অন্তত দুই সদস্যবিশিষ্ট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে। এ কমিটিকে বছরে কমপক্ষে চারটি সভা করতে হবে এবং সভার কার্যবিবরণী পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালা কোনোভাবেই কমিশনের বিধিমালার তুলনায় শিথিল হতে পারবে না।
মেইনটেন্যান্স মার্জিন ৭০ শতাংশ
খসড়া অনুযায়ী, গ্রাহকের ইক্যুইটি সবসময় মার্জিন অর্থায়নের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ থাকতে হবে। কোনো কারণে তা ৭০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহককে মার্জিন কল দিতে হবে। লিখিতভাবে অথবা নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ও ই-মেইলের মাধ্যমে এ নোটিশ দিতে হবে। প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগ করেও বিষয়টি জানাতে হবে।
তিন কার্যদিবসেও সমন্বয় না হলে নতুন ঋণ নয়
মার্জিন কল দেওয়ার পর তিন কার্যদিবসের মধ্যেও যদি গ্রাহক প্রয়োজনীয় মার্জিন জমা না দেন অথবা ইক্যুইটি ৭০ শতাংশে উন্নীত করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে নতুন করে কোনো মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ইক্যুইটি পুনঃস্থাপনের জন্য প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের হিসাবে থাকা প্রয়োজনীয় সংখ্যক শেয়ার বিক্রি করতে পারবে।
ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলেই বাধ্যতামূলক বিক্রি
সংশোধিত খসড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের ইক্যুইটি যদি মার্জিন অর্থায়নের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিকিউরিটি বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি করতে হবে। তবে বিক্রির নির্দেশ দেওয়ার পরও বাজার পরিস্থিতির কারণে তাৎক্ষণিক বিক্রি সম্ভব না হলে বা বিলম্ব ঘটলে সৃষ্ট ক্ষতির দায় মার্জিন অর্থায়নকারীর ওপর বর্তাবে না।
কোন শেয়ারে মার্জিন ঋণ মিলবে
শুধুমাত্র স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শেয়ারের বিপরীতে মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে। তবে ‘জি’, ‘এন’ ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার এবং এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত কোনো সিকিউরিটিতে মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না।
ন্যূনতম তিন লাখ টাকার বিনিয়োগ
মার্জিন ঋণের জন্য গ্রাহকের হিসাবে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিতে অন্তত তিন লাখ টাকার বিনিয়োগ থাকতে হবে। এছাড়া গ্রাহক নিজস্ব অর্থে মার্জিন-অযোগ্য শেয়ার কিনলেও সেগুলো মার্জিন হিসাবের ইক্যুইটির অংশ হিসেবে গণ্য হবে না।
পিই ও পিবি অনুপাতে কঠোর শর্ত
খসড়া অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির মূল্য-আয় (পি/ই) অনুপাত ৩০-এর বেশি হলে অথবা কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে না।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পিই অনুপাতের পরিবর্তে প্রাইস-টু-বুক ভ্যালু (পি/বি) অনুপাত বিবেচনা করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পি/বি অনুপাত ৩-এর বেশি হলে এবং বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ১-এর বেশি হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে না।
এছাড়া কোনো কোম্পানির সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় যদি ইপিএস নির্ধারণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে ওই কোম্পানির শেয়ার মার্জিন অর্থায়নের জন্য অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জকে নিয়মিতভাবে তাদের ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর পিই ও পিবি অনুপাত প্রকাশ করতে হবে।
গবেষণা দলের স্বাধীনতা
মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বিভাগের সদস্যদের বেতন-ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং কমিশন আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রাখা যাবে না।
শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়ন
কোনো প্রতিষ্ঠান ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়ন চালু করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড অথবা শরিয়াহ উপদেষ্টার সুপারিশ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
একক শেয়ারে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বিনিয়োগ
খসড়া অনুযায়ী, কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার মোট মার্জিন অর্থায়নের ২০ শতাংশের বেশি একটি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করতে পারবে না। একইভাবে কোনো একক গ্রাহককে দেওয়া মার্জিন অর্থায়নেরও ২০ শতাংশের বেশি কোনো একক শেয়ারে বিনিয়োগ করা যাবে না।
এছাড়া সংশোধনীতে ৭০ শতাংশ মেইনটেন্যান্স মার্জিন বজায় রাখা এবং ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির বিধানও পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এসএ খান/


