নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গত দেড় বছরে কারসাজির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (Bangladesh Securities and Exchange Commission–BSEC)। বিভিন্ন সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, যা ১৯৯৩ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে বড় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে জরিমানার পরিমাণ বড় হলেও তা আদায়ের ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই সীমিত। এখন পর্যন্ত মোট জরিমানার মাত্র ০.৩৫ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জরিমানার আওতায় যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গঠিত কমিশন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, শেয়ারবাজারে অনিয়মের বিরুদ্ধে এই কঠোর এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম শুরু করে।
সবচেয়ে বড় জরিমানা করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান–এর মালিকানাধীন বেক্সিমকো লিমিটেড (Beximco Limited) ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে, যার পরিমাণ ৪২৮ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা আবুল খায়ের হিরু এবং তার সহযোগী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মোট ১৯৪ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বিমা খাতের শেয়ার কারসাজির অভিযোগে আরও অন্তত ৫০ জন বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধে ৩৫১ কোটি টাকার জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।
যেসব কোম্পানির শেয়ারে কারসাজি
তদন্তে উঠে এসেছে, একাধিক কোম্পানির শেয়ার নিয়ে সংগঠিতভাবে কারসাজি করা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স (Karnaphuli Insurance), প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স (Paramount Insurance), ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স (Delta Life Insurance), এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক (NRB Commercial Bank), সোনালী পেপার (Sonali Paper), ফরচুন সুজ (Fortune Shoes) এবং জেমিনি সি ফুড (Gemini Sea Food)।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, আগের কমিশনের সময়ে এসব অনিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত ছিল। তবে বর্তমান কমিশন এসব ঘটনার বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে।
জরিমানা আদায়ে আইনি জটিলতা
বিএসইসির বিধি অনুযায়ী জরিমানা আরোপের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। তবে দণ্ডপ্রাপ্তরা তিন মাসের মধ্যে রিভিউ এবং ছয় মাসের মধ্যে রিভিশনের আবেদন করার সুযোগ পান।
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, কারসাজিকারীরা যাতে অবৈধভাবে অর্জিত মুনাফা ধরে রাখতে না পারে, সে উদ্দেশ্যেই তাদের লাভের বড় অংশ জরিমানা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতে চ্যালেঞ্জ করার কারণে এসব অর্থ আদায়ে সময় লাগছে।
এদিকে জরিমানা পরিশোধ না করা এবং লভ্যাংশ ঘোষণা না করার ঘটনায় আরও প্রায় ২৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো জরিমানার অর্থ আদায় করা না গেলে শেয়ারবাজার সংস্কারের এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই কঠোর নজরদারি ও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জরিমানা আদায় নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।


