সাহাবুদ্দিন-এস আলমসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিপাকে ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা

সময়: বুধবার, আগস্ট ১২, ২০২৬ ১১:৫৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসীন আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বেনামি প্রতিষ্ঠানে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাহাবুদ্দিন, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (মাসুদ) ওরফে এস আলমসহ ৩৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত ২৯ জুলাই দুদকে অভিযোগ করেছিলেন মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াসিন আলী। এই নিয়ে গত সোম ও মঙ্গলবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে মঙ্গলবার তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে ব্যাংকের ট্রেনিং একাডেমিতে পাঠায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বরখাস্তকালীন তিনি মূল বেতনের অর্ধেক পাবেন বলে জানা গেছে।

ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, হেড অফিসের অনুমোদন না নিয়ে দুদকে অভিযোগ দেওয়ার কারণে ইয়াসিন আলীর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে ইয়াসিন আলী দাবি করেছেন, শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ীই তিনি দুদকে অভিযোগটি জমা দিয়েছেন। তাকে কেন বরখাস্ত করা হয়েছে এবং এর শর্ত কী, এই বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

ইয়াসিন আলী বলেন, এস আলমের ঋণ অনিয়মের ঘটনায় ইসলামী ব্যাংকের একাধিক মামলা রয়েছে। আদালতের নির্দেশনার পর একটি মামলার তথ্য সরবরাহের অংশ হিসেবে দুদককে ঋণসংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, কমিশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। কমিশন গঠনের পর অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগকারী কর্মকর্তা হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযোগ করেছেন। এই কারণে ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ তাকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করেছে। একইসঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এর আগে গত ২৯ জুলাই ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী দুদকে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নামের বানান ভুল করে ‘মো. শাহাবুদ্দিন’ লেখা হয়েছে। একইসঙ্গে তার রাষ্ট্রপতি পরিচয় উল্লেখ না করে তাকে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে সাহাবুদ্দিন, এস আলমসহ ৩৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা পরস্পরের যোগসাজশে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেন। পর্যাপ্ত জামানত ও নিশ্চয়তা ছাড়াই এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে ঋণ অনুমোদনের কারণে ব্যাংকটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড আগে একটি রুগ্ণ ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগসীমা ছিল ১০০ কোটি টাকা। পরে প্রভাব খাটিয়ে ধাপে ধাপে এর সীমা ২০০ কোটি এবং একপর্যায়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়।

২০১৭ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে শাখা থেকে হেড অফিসে ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয়। আর ২০১৭ সালের ২০ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত এক্সিকিউটিভ বোর্ডের বিভিন্ন সভায় এসব ঋণ অনুমোদন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋণ পরিশোধের জন্য ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একাধিকবার তাগাদাপত্র ও চূড়ান্ত তাগাদাপত্র দেওয়া হলেও ঋণ পরিশোধ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস ওরফে আলহাজ মো. ইউনুস বাদলের নাম রয়েছে। গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেডের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন পরিচালককেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল আলম (মাসুদ) ওরফে এস আলমকে ওই ঋণসুবিধার সুবিধাভোগী হিসেবে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক, নির্বাহী কমিটির সদস্য, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার নামও রয়েছে অভিযোগের তালিকায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের উচিত স্বচ্ছতার সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করা এবং অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পেছনে কোনো চাপ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা। অন্যথায় ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি উন্মোচনে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ আসতে পারে।

Share
নিউজটি ৩ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged