মাইডাস ফাইন্যান্সে ৭৮৮ কোটি টাকার ঋণ, ঘাটতি প্রভিশন ৩২ কোটি

সময়: রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৬ ১২:১২:৫৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৫ সালের আর্থিক বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে মাইডাস ফাইন্যান্স পিএলসি নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক। কোম্পানিটির ৭৮৮ কোটি ৮২ লাখ টাকার লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের মধ্যে ৪৩২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ। অন্যদিকে, এসব ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ২৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এর বাইরে অন্যান্য প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে আরও ৬ কোটি টাকা।

মাইডাস ফাইন্যান্স পিএলসির ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘এমফাসিস অব ম্যাটার’ বা বিশেষ গুরুত্বারোপ বিষয়ক অনুচ্ছেদে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি নিরীক্ষা করেছেন ইসলাম আফতাব কামরুল অ্যান্ড কোম্পানি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের ব্যবস্থাপনা অংশীদার এ কে এম কামরুল ইসলাম, এফসিএ।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মাইডাস ফাইন্যান্সের লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৭৮৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৪৩২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং অশ্রেণিকৃত ঋণ ৩৫৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী, ৪১টি পৃথক লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে প্রভিশনের মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। একই সঙ্গে অন্যান্য প্রভিশনের ঘাটতি রয়েছে ৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা দুই ধরনের প্রভিশন ঘাটতি মিলিয়ে মোট ঘাটতির পরিমাণ ৩১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

প্রভিশন ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিএফআইএমের কাছে স্থগিত সুবিধা বা ডিফারমেন্ট সুবিধা চেয়ে আবেদন করেছে মাইডাস ফাইন্যান্স। এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের ২২ জুন একটি চিঠি জারি করে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিএফআইএমের ওই চিঠির মাধ্যমে ২০২২ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরে প্রভিশন ঘাটতি সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। চিঠিটির রেফারেন্স নম্বর ডিএফআইএম(সি)১০৫৪/৪১/২০২৩-২১৯১, তারিখ ২২ জুন ২০২৩।

কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে দাবিবিহীন লভ্যাংশ বাবদ ৯ লাখ ৬০ হাজার ৮১৫ টাকা অন্যান্য দায়ের অধীনে দেখানো হয়েছে। তবে এই উপস্থাপনাকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষক।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারি বিএসইসি একটি সার্কুলার জারি করে। সার্কুলারটির নম্বর বিএসইসি/সিএমআরআরসি/২০২১-৩৮৬/০৩। ওই নির্দেশনায় দাবিবিহীন লভ্যাংশ আলাদা লাইন আইটেম হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু মাইডাস ফাইন্যান্স দাবিবিহীন লভ্যাংশকে অন্যান্য দায়ের অধীনে উপস্থাপন করেছে।

২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাইডাস ফাইন্যান্সের নিট সুদজনিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি ৮৬ লাখ ৮৪ হাজার ৯৯৬ টাকা। একই সময়ে কোম্পানিটির মোট পরিচালন ক্ষতি হয়েছে ৪৬ কোটি ৩৫ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৯ টাকা।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো কর-পরবর্তী নিট লোকসান। বছর শেষে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৩৫ কোটি ২৯ লাখ ৯৩৯ টাকা।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মাইডাস ফাইন্যান্সের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত বা সিআরএআর ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৫০ কোটি ৬ লাখ ৬১ হাজার ৩৬০ টাকা।

একই তারিখে কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ছিল ঋণাত্মক ২৬৬ কোটি ১ লাখ ২৭ হাজার ৭৭৭ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটির দায় ও সম্পদের অবস্থানের কারণে শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে।

নিরীক্ষক আরও উল্লেখ করেছেন, আমানতকারীদের প্রয়োজন মেটাতে মাইডাস ফাইন্যান্স বর্তমানে তারল্য সংকটের মুখোমুখি। কোম্পানিটির পর্যাপ্ত তারল্য ব্যবস্থাপনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরলেও নিরীক্ষক জানিয়েছেন, এসব বিষয়ে তাঁর নিরীক্ষা মতামত পরিবর্তিত বা সংশোধিত হয়নি। প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়েছে, উল্লিখিত বিষয়গুলোর কারণে নিরীক্ষকের মতামত পরিবর্তন করা হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাইডাস ফাইন্যান্সের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। খেলাপি ঋণের উচ্চহার, প্রভিশন ঘাটতি, বিশাল অঙ্কের লোকসান, মূলধন ঘাটতি ও ঋণাত্মক শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি কোম্পানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারল্য সংকটের কারণে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সমস্যা হলে গ্রাহকদের আস্থা আরও ক্ষুণ্ণ হতে পারে। কোম্পানিটির পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

Share
নিউজটি ২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged