নিজস্ব প্রতিবেদক: বিনিয়োগকারীর অজ্ঞাতে শেয়ার বিক্রি, অননুমোদিত লেনদেন ও ব্রোকারেজ হাউজের নানা ধরনের জালিয়াতি ঠেকাতে নতুন স্মার্ট মোবাইল অ্যাপ চালু করতে যাচ্ছে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সিডিবিএল জানিয়েছে, অ্যাপটির কার্যকারিতা যাচাই করতে বর্তমানে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বা টেস্ট রান চলছে। এই পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ব্যবহারের জন্য অ্যাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হবে।
নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা তাদের নগদ অর্থ ও শেয়ার পোর্টফোলিওতে কোনো ধরনের অননুমোদিত পরিবর্তন বা হাতবদল হলে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারবেন। ফলে নিজের অজান্তে বিও হিসাবে কোনো লেনদেন বা শেয়ার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত তা সম্পর্কে জানতে পারবেন বিনিয়োগকারী।
দেশে ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে শেয়ার সংরক্ষণ, সিকিউরিটিজ হস্তান্তর এবং নিষ্পত্তির একমাত্র স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করে সিডিবিএল। এ কারণে সংস্থাটির মূল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত তথ্যই একজন বিও হিসাবধারীর প্রকৃত সম্পদের আইনি দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অতীতে কিছু অসাধু ব্রোকারেজ হাউজ নিজস্ব ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুয়া ও জাল পোর্টফোলিও বিবরণী সরবরাহ করেছে। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকাকালে কিছু প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞাতে তাদের বিও হিসাব থেকে শেয়ার বিক্রি করে অবৈধভাবে মুনাফা নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
পরবর্তীতে শেয়ারের দাম কমে গেলে ওই শেয়ার আবার কিনে হিসাব সমন্বয়ের বেআইনি চেষ্টা করা হতো। এর আগে মশিহুর সিকিউরিটিজ ও তামহা সিকিউরিটিজের মতো প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণ শেয়ার ও অর্থ আত্মসাৎ করেছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্তে এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়।
সিডিবিএলের নতুন স্মার্ট অ্যাপ চালু হলে এ ধরনের গোপন অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ ব্রোকারেজ হাউজের দেওয়া পোর্টফোলিও বিবরণীর সঙ্গে অ্যাপে প্রদর্শিত সিডিবিএলের মূল রেকর্ডের কোনো পার্থক্য থাকলে বিনিয়োগকারী নিজেই তা সহজে শনাক্ত করতে পারবেন।
সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল মুতালেব জানিয়েছেন, অ্যাপটিতে নিবন্ধন করার পর বিনিয়োগকারীর শেয়ার লেনদেন বা পোর্টফোলিওতে সামান্য পরিবর্তন হলেও সঙ্গে সঙ্গে তার মোবাইলে পপ-আপ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে।
একই সঙ্গে অ্যাপ ব্যবহারকারীরা রিয়েল-টাইম বাজারদরের ভিত্তিতে নিজেদের সিকিউরিটিজের বর্তমান মূল্য এবং সম্পূর্ণ পোর্টফোলিওর বাজারমূল্য সরাসরি দেখতে পারবেন।
শুধু শেয়ার লেনদেনের নিরাপত্তা ও তদারকি নয়, বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বেশ কিছু আধুনিক সুবিধা রাখা হয়েছে অ্যাপটিতে। এর মাধ্যমে লভ্যাংশ বা নগদ লভ্যাংশসংক্রান্ত বিভিন্ন করপোরেট ঘোষণা, হালনাগাদ তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা অ্যাপ থেকেই তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর, ব্যাংক হিসাব নম্বর এবং বর্তমান বা স্থায়ী ঠিকানার মতো ব্যক্তিগত তথ্য সংশোধন করার সুযোগ পাবেন।
নতুন বিও বা বেনিফিশিয়ারি ওনার্স হিসাব খোলার সুবিধাও অ্যাপটিতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে নতুন বিও হিসাব খোলার জন্য বিনিয়োগকারীদের আর সরাসরি ব্রোকারেজ হাউজে গিয়ে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে না।
এ জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে দ্রুত এনআইডি যাচাইয়ের সুবিধা পেতে এপিআই সংযোগ চেয়েছে সিডিবিএল। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এই সংযোগ পাওয়া গেলে বিনিয়োগকারীরা ঘরে বসেই জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই সম্পন্ন করে সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে নতুন বিও হিসাব খুলতে পারবেন।
সিডিবিএলের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের শেয়ার ও নগদ অর্থের অবস্থান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি অননুমোদিত লেনদেন সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারবেন। ফলে ব্রোকারেজ হাউজের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম শনাক্ত করা এবং বিনিয়োগকারীদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


