প্রভাবশালীদের ঋণ অনিয়মের বোঝা, দুর্বল হয়ে পড়ছে ব্যাংক খাত

সময়: শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২৬ ৯:৩৩:০১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম এবং প্রকৃত ঋণ পরিস্থিতির তথ্য গোপন রাখার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এস আলম, বেক্সিমকো এবং নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারের মতো বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে ঘিরে ব্যাংকের সুশাসন, ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া ও আর্থিক জবাবদিহি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রচলিত নিয়মনীতি ও ঋণশৃঙ্খলা উপেক্ষা করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণের একটি অংশ নির্ধারিত সময়ে খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ না করায় ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি দীর্ঘদিন আড়ালে ছিল।

বর্তমানে ওই ঋণগুলোর বড় অংশ খেলাপি হিসেবে সামনে আসায় ব্যাংক খাতের আর্থিক পরিস্থিতির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিপুল পরিমাণ শ্রেণীকৃত ঋণ, মূলধনের ঘাটতি এবং ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতা ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলেছে। এর প্রভাব শুধু মুনাফা অর্জন ও নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নেই; আমানতকারীদের আস্থা এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাও এখন উদ্বেগের মুখে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন শ্রেণীকৃত ঋণ। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকার ঋণ খেলাপি বা শ্রেণীকৃত অবস্থায় রয়েছে। ঋণের এত বড় অংশ অনাদায়ি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর আয়, সম্পদের গুণগত মান এবং আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।

মাত্র ১০ ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত ৭২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক খাতের সংকট সব প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে বিস্তৃত নয়। বরং কয়েকটি ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের বড় অংশ জমা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে পুরো ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল।

এই ব্যাংকগুলো হলো জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

এই ১০ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ি থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলে লোকসান সামাল দেওয়া এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যাংকভিত্তিক পরিসংখ্যানেও সংকটের তীব্রতা স্পষ্ট। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের অনুপাত এত বেশি যে তাদের মোট ঋণপোর্টফোলিওর বড় অংশই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি আন্তব্যাংক লেনদেন এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের ভার

ব্যাংক খাতের সংকটের আলোচনায় ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ এবং বড় অঙ্কের অর্থের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে এক লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে। গ্রুপটির প্রধানকে ঘিরে অর্থ স্থানান্তর এবং ঋণ পরিশোধের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এসব ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে দেখা যায়। সর্বশেষ উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।

অন্যান্য কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থাও উদ্বেগজনক। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৭৫ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে এই হার প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে ৯৬ শতাংশের কাছাকাছি। এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৮ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। অন্যদিকে, আইএফআইসি ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত যথাক্রমে ৬৩ ও ৬৫ শতাংশের বেশি।

এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, কয়েকটি ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিওতে ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত বেশি। অতীতে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ঋণ আদায়ে দুর্বলতা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও কিছু ব্যাংক থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো একই মাত্রায় ঋণ নিতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে। এসব ব্যাংকের কয়েকটির খেলাপি ঋণের অনুপাত ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অর্থাৎ, পুরো ব্যাংক খাতের আর্থিক পরিস্থিতি একরকম নয়। কিছু ব্যাংকের ঋণের মান তুলনামূলক ভালো থাকলেও অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গুরুতর সংকটে পড়েছে। এই বৈষম্য ব্যাংকভিত্তিক তদারকি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকার বেশি

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো মূলধনের ঘাটতি। সম্ভাব্য ঋণক্ষতি মোকাবিলা এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকের মূলধন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। ঋণের বড় অংশ অনাদায়ি হয়ে পড়লে সম্পদের গুণগত মান কমে যায়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় মূলধন বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত বা সিআরএআর ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে ব্যাংক খাতের নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের জুনের মূল্যায়নেও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বল মূলধন পরিস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

মূলধন ঘাটতি বাড়তে থাকলে আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে নতুন ঋণ বিতরণ, বিদ্যমান ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত অত্যন্ত বেশি, সেগুলোর মূলধন পুনর্গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রভিশন ঘাটতিতে বাড়ছে আর্থিক দুর্বলতা

ঋণের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার জন্য ব্যাংকগুলোকে নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রভিশন বা সংস্থান হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণক্ষতির প্রভাব ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর আরও তীব্র হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। এই ঘাটতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করা না গেলে হিসাবের খাতায় দেখানো সম্পদের মূল্য এবং বাস্তবে সেই সম্পদের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করতে গেলে ব্যাংকগুলোর আয় ও মূলধনের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে মূলধন সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তাই খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতি পূরণও ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন

দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। এই একীভূতকরণের লক্ষ্য হলো দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করতে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই, পরিচালন কাঠামো পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

তবে শুধু ব্যাংক একীভূত করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। পুরোনো ঋণের প্রকৃত আদায়যোগ্যতা নির্ধারণ, ঋণ বিতরণে অনিয়মের তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বাস্তবসম্মত ঋণ আদায় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা সম্ভব না হলে নতুন ব্যাংকের মূলধন বাড়ানোর পরও ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

একীভূতকরণের সফলতা নির্ভর করবে নতুন প্রতিষ্ঠানের পরিচালন দক্ষতা, সম্পদের গুণগত মান, ঋণ আদায়ের অগ্রগতি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর। পাশাপাশি পুরোনো ঋণ ও দায়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে আমানতকারীসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।

আমানত সুরক্ষায় নতুন আইন, তবে রয়েছে সীমাবদ্ধতা

ব্যাংক খাতের সংকটের মধ্যে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের আমানত সুরক্ষা আইনে আমানত সুরক্ষার সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে যোগ্য আমানতকারীরা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

তবে সুরক্ষার সীমা দুই লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে প্রত্যেক আমানতকারী তাঁর সম্পূর্ণ জমা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাবেন, এমন নয়। এ ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা, প্রযোজ্য শর্ত এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকের সম্পদের মান উন্নয়ন, ঋণ আদায় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, সম্পদের মান যাচাই, ঋণ শ্রেণীকরণ এবং প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা আমানত সুরক্ষা, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, তদারকির স্বচ্ছতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতার ওপর। শুধু নীতিমালা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; ব্যাংকগুলোর আর্থিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

সংকট কাটাতে ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন ও সুশাসন জরুরি

২০২৬ সালের জুনের পরিসংখ্যান দেশের ব্যাংক খাতের সামনে থাকা সংকটের গভীরতা তুলে ধরেছে। বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতা এবং দুর্বল সুশাসন—সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি চাপে রয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এক নয়। কয়েকটি ব্যাংকে ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত বেশি হলেও অন্য কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত তুলনামূলক কম।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রথমেই খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঋণ বিতরণে অনিয়মের তদন্ত এবং দায় নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ ও প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করার পাশাপাশি ব্যাংকভিত্তিক আর্থিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করাও প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে রাজনৈতিক কিংবা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। ব্যাংক খাতের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারি ও নিয়মের সমান প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে, ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলার বিষয়টি শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকগুলো কতটা ক্ষতি সামাল দিতে পারছে, কীভাবে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করছে এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষায় কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে—এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে।

Share
নিউজটি ৪ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged