স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে বিপর্যস্ত উত্তরা ফাইন্যান্স

সময়: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬ ৬:০৫:৩৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই ও উপযুক্ত জামানত গ্রহণ ছাড়াই ঋণ বিতরণ এবং শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট নানা অনিয়মের কারণে গভীর আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড। বছরের পর বছর আর্থিক অনিয়ম, তীব্র মূলধন ঘাটতি, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশে অস্বাভাবিক বিলম্ব এবং পরিচালনা পর্ষদে ঘনঘন পরিবর্তনের ফলে প্রতিষ্ঠানটির সুশাসন ও অস্তিত্ব নিয়েই চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় গত আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ বাতিল করে তা ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক পরিচালক মোস্তাকুর রহমানকে প্রতিষ্ঠানটির নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতেও একবার বিএসইসি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষকর্তাদের পদত্যাগের জেরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুনরায় হস্তক্ষেপ করতে হয়।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালের মধ্যভাগ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সময়কালে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র ফুটে উঠেছে। পর্ষদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে লোকবল নিয়োগ, অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদান এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিসাধন করেছেন। এমনকি ঋণ অনুমোদনকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রশাসনিক স্থবিরতা চরম রূপ ধারণ করে।

এদিকে, শীর্ষ পর্ষদের দ্বন্দ্বের সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে কর্মরত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মী ও কর্মকর্তাদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ রয়েছে। স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজস্ব লোকবল বসাতে গিয়ে যোগ্য কর্মীদের ছাঁটাই করায় প্রতিষ্ঠানটি যেমন পেশাদারিত্ব হারিয়েছে, তেমনি ভুক্তভোগী কর্মীরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানটির সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো বার্ষিক আর্থিক হিসাব চূড়ান্তকরণে চার বছরের দীর্ঘ বিলম্ব। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরপর চার অর্থবছরের কোনো নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী প্রকাশ না করায় সাধারণ বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের কাছে উত্তরা ফাইন্যান্সের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২১ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনেই প্রতিষ্ঠানটির ভয়াবহ মূলধন ঘাটতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী যেখানে ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষেত্রে তা নেমে এসেছিল ঋণাত্মক ৫.৭২ শতাংশে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শত শত কোটি টাকার অননুমোদিত লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত বহিরাগত নিরীক্ষকের ২০২০ সালের অডিট পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে।

উত্তরা ফাইন্যান্সের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের দায়ে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জামানতবিহীন ও অননুমোদিত ঋণ বিতরণের মাধ্যমে প্রায় ৬৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে ১২টি পৃথক মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও অর্থ পাচার ও জালিয়াতির অভিযোগে সাবেক এমডিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।

বারবার পর্ষদ বিলুপ্তি ও পদত্যাগের ঘটনায় উত্তরা ফাইন্যান্সের প্রশাসনিক কাঠামো বর্তমানে পুরোপুরি ভঙ্গুর। এমন পরিস্থিতিতে নতুন প্রশাসকের মাধ্যমে অনাদায়ী ঋণ উদ্ধার, হিসাবের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষুণ্ণ হওয়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্বাসিত করা কতটা সম্ভব হবে—তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে উত্তরা ফাইন্যান্সের নবনিযুক্ত প্রশাসক মো. মোস্তাকুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে জানান, প্রতিষ্ঠানের বকেয়া হিসাব দ্রুত চূড়ান্ত করা এবং অনিয়ম চিহ্নিত করে অর্থ উদ্ধার করাই তাঁদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ২০২১ সালের পর কোনো অডিট না থাকায় বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীরা আস্থা হারিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অ্যাকাউন্টস ফাইনাল করার লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পনা ও পুনর্বাসনের কাজ শুরু করা হয়েছে।

 

Share
নিউজটি ১৫ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged