নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার, তারল্যপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে মূলধনি মুনাফার ওপর কর অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। সংগঠনটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ থেকে ব্যক্তি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মূলধনি মুনাফার ওপর সম্পূর্ণ কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে ডিবিএ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের কাছে প্রস্তাবটি জমা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান আয়কর কাঠামো অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ থেকে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মূলধনি মুনাফার সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা রয়েছে। তবে এই সীমা অতিক্রম করলে অতিরিক্ত মুনাফার ওপর সাধারণভাবে ১৫ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হয়।
ডিবিএ মনে করে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে মূলধনি মুনাফার ওপর পূর্ণ কর অব্যাহতি পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশি ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বর্তমানে কার্যকর করব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
ডিবিএর মতে, মূলধনি মুনাফা করমুক্ত করা হলে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়বে। এতে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্জিত মুনাফা পুনরায় বাজারে বিনিয়োগের প্রবণতাও জোরদার হতে পারে।
সংগঠনটি মনে করে, এ ধরনের করসুবিধা দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য শেয়ারভিত্তিক মূলধন বা ইকুইটি অর্থায়নের পথ আরও সম্প্রসারিত হবে।
ডিবিএর জমা দেওয়া প্রস্তাবনায় আয়কর আইন, ২০২৩-এর প্রাসঙ্গিক বিধান সংশোধনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংগঠনটির সুপারিশ অনুযায়ী, স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সম্পাদিত এবং নির্ধারিত কেন্দ্রীয় ডিপোজিটরি ব্যবস্থায় নিষ্পত্তিকৃত যোগ্য সিকিউরিটিজ লেনদেন থেকে অর্জিত মূলধনি মুনাফাকে করের আওতামুক্ত রাখা যেতে পারে।
তবে কর অব্যাহতির প্রস্তাব দিলেও কোম্পানির উদ্যোক্তা বা স্পনসর, পরিচালক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত করব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে ডিবিএ।
অন্যদিকে, বিদেশি ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের করব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও প্রস্তাবনায় পৃথকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ডিবিএ জানিয়েছে, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হলে শেয়ারবাজারে মূলধনি মুনাফা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর হিসাবের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর হবে।
সংগঠনটির বিবেচনায়, সিসিবিএলের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হওয়ার আগপর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য কর অব্যাহতির সুবিধা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এ কারণে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মূলধনি মুনাফার ওপর সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিবিএ মনে করে, এই সময়ের মধ্যে বিনিয়োগবান্ধব করনীতি কার্যকর থাকলে শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বাড়ানো সম্ভব হবে।
ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেছেন, দেশের শেয়ারবাজারে আস্থা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উপযোগী করব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, বিনিয়োগকারীদের জন্য করনীতি আরও সহায়ক করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজার থেকে প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের আরও বেশি সুযোগ পাবে।
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, শেয়ারবাজারের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, বিনিয়োগবান্ধব করব্যবস্থা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিবিএ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মূলধনি মুনাফায় কর অব্যাহতির প্রস্তাবটি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনার অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিদ্যমান আইনে সংশোধনী আনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বাজারে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে ডিবিএ।


