দুই ফান্ডের খসড়া প্রসপেক্টাস অনুমোদন

বিএসইসির আশ্বাসে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে স্বস্তি, ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা

সময়: শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২৬ ৯:১৯:১০ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। খাতটির উন্নয়ন ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা সংশোধন ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে কোনো অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সর্বোত্তম চর্চার ভিত্তিতে খাতটির উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন ইতিবাচক বার্তা মিউচুয়াল ফান্ড খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক দরপতনের পর গত সপ্তাহে বেশ কয়েকটি ফান্ডের ইউনিট দরে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা যাওয়ায় খাতটি নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

এর আগে বিএসইসির একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরের সপ্তাহে বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দরে বড় ধরনের পতন ঘটে। একই সময়ে ফান্ডগুলোর ইউনিট দর ও নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে গত সপ্তাহের লেনদেনে অনেক ফান্ড আগের পতনের ধাক্কা কাটিয়ে ইতিবাচক ধারায় ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারদর নির্ধারণে যেমন আয়, নিট সম্পদমূল্য ও নগদ অর্থপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তেমনি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর নির্ধারণেও সম্পদমূল্য একটি মৌলিক বিবেচ্য বিষয়। তবে বাস্তবে শেয়ার কিংবা মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর কেবল নির্দিষ্ট আর্থিক সূচক বা নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

তাদের মতে, একটি কোম্পানির শেয়ারদরের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, মূলধনের অবস্থা এবং মালিকানা কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। একইভাবে মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দরেও সংশ্লিষ্ট ফান্ডের মূলধন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, অতীত কার্যক্রম এবং বাজারে প্রতিষ্ঠানের সুনাম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ফলে শুধু নিট সম্পদমূল্য বিবেচনা করে কোনো ফান্ডের ইউনিট দরের সামগ্রিক অবস্থান মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়।

শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির শেয়ার তাদের প্রকৃত নিট সম্পদমূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দরে কেনাবেচা হচ্ছে। এমনকি কিছু দুর্বল কোম্পানির নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর শেয়ারদর অস্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছানোর নজির রয়েছে।

অন্যদিকে, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের চিত্র অনেকটাই বিপরীত। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট তাদের প্রকৃত নিট সম্পদমূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্য কম দরে লেনদেন হচ্ছে। মাত্র দুই থেকে চারটি ফান্ডের ইউনিট দর এনএভির সামান্য ওপরে অবস্থান করলেও অধিকাংশ ফান্ডের ইউনিট দর সম্পদমূল্যের তুলনায় অনেক নিচে রয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের একাংশের মূল্যায়নে, এ পরিস্থিতি মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ব্যাপক অবমূল্যায়নের চিত্র তুলে ধরছে। অথচ দেশের শেয়ারবাজারের অতীত ইতিহাসে এমন সময়ও ছিল, যখন বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট তাদের প্রকৃত সম্পদমূল্যের পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি দরে লেনদেন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মৌলিক আর্থিক সূচক বিবেচনায় বর্তমান মিউচুয়াল ফান্ড খাত তুলনামূলক শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং ইতিবাচক নীতিগত সহায়তা খাতটিকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫’ পর্যালোচনা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় খাতটির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

সভায় তিনি জানান, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের বিধিমালা পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাতটির জন্য কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বিএসইসি চেয়ারম্যানের মতে, দেশের শেয়ারবাজারকে গতিশীল, স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিকল্প নেই। কেবল ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করে শেয়ারবাজারের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এ কারণে বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে আরও কার্যকর করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান আরও বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত না করে দেশের শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব নয়।

তিনি জানান, এ খাতের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিনিয়োগবিষয়ক শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শেয়ারবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন অবস্থান মিউচুয়াল ফান্ড খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে বিধিমালা সংশোধনের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত বিবেচনা এবং অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত পরিহারের আশ্বাস বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

বিএসইসির আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি, কাস্টোডিয়ান এবং বিভিন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

সভায় মিউচুয়াল ফান্ড খাতের বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও কার্যকর, যুগোপযোগী ও বিনিয়োগবান্ধব করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। খাতটির উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অংশীজনদের মধ্যে ইতিবাচক সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে মিউচুয়াল ফান্ড খাত দ্রুতই সাম্প্রতিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে খাতটি স্বাভাবিক লেনদেনের ধারায় ফিরে আসার সুযোগ পাবে।

তাদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলোর জন্যই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

Share
নিউজটি ২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged