নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটে থাকা দেশের শেয়ারবাজারে জালিয়াতি ও কারসাজি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আইপিও জালিয়াতি ও বাজার অনিয়ম ঠেকাতে অতীতে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় এখন ব্লকচেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের প্রস্তাব গুরুত্ব পাচ্ছে।
পুঁজিবাজারের অতীত অভিজ্ঞতা বেশ নেতিবাচক। ১৯৯৬ এবং বিশেষ করে ২০১০-১১ সালের ধসে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারিয়ে যায়, যা সে সময় দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২২ শতাংশের সমান ছিল। এতে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন এবং এর প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান।
সাম্প্রতিক সময়েও অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট। গত দেড় বছরে বাজার কারসাজি ও বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে এর অল্প অংশই আদায় সম্ভব হয়েছে, যা শাস্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাই এসব সমস্যার মূল কারণ। ওমনিবাস অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার, প্লেসমেন্ট শেয়ারে অনিয়ম, আইপিও তহবিলের অপব্যবহার এবং রিয়েল-টাইম নজরদারির ঘাটতি বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের শেয়ারবাজারের বাজারমূল্য জিডিপির মাত্র ৬ শতাংশে অবস্থান করছে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম।
এই প্রেক্ষাপটে ব্লকচেইন ও এআই প্রযুক্তিকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্লকচেইন ব্যবহারের মাধ্যমে আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা সম্ভব, কারণ এতে প্রতিটি লেনদেন স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং অনুমোদিত অংশগ্রহণকারীরা তা যাচাই করতে পারেন। স্মার্ট কনট্রাক্ট ব্যবহারের ফলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ ছাড়া অর্থ ছাড় করা যাবে না, ফলে অনিয়মের সুযোগ কমবে।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত লেনদেন বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্ত করতে সক্ষম। এতে সম্ভাব্য কারসাজি আগেভাগেই ধরা পড়বে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই দুই প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে—যেখানে ব্লকচেইন নিশ্চিত করবে তথ্যের স্বচ্ছতা এবং এআই সরবরাহ করবে তাৎক্ষণিক সতর্ক সংকেত।
বাংলাদেশেও ধাপে ধাপে এই প্রযুক্তি চালুর সুযোগ রয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে ব্লকচেইনভিত্তিক আইপিও প্রবর্তন এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে এআই-নির্ভর নজরদারি চালু করা যেতে পারে। এর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার না আনলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা আরও বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং সঞ্চয় বিকল্প অনানুষ্ঠানিক খাতে সরে যেতে পারে। বিপরীতে, আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা গেলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে, ঝুঁকি কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
তাদের মতে, জালিয়াতি কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়; এটি সুশাসনের ঘাটতির ফল। সঠিকভাবে ব্লকচেইন ও এআই প্রয়োগ করা গেলে দেশের শেয়ারবাজারে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আর্থিক খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।


