নিজস্ব প্রতিবেদক : পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন বিধানে মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইক্যুইটি মোট মার্জিন অর্থায়নের অন্তত ৫০ শতাংশ রাখার বাধ্যবাধকতা থাকছে। একই সঙ্গে কোনো গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই প্রয়োজনীয় সিকিউরিটিজ বিক্রি করতে পারবে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫ সংশোধনের গেজেট শিগগিরই প্রকাশ হতে পারে। বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি কমানো, মার্জিন অর্থায়নে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতেই সংশোধিত বিধিমালায় একাধিক নতুন বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।
নতুন বিধিমালায় মার্জিন অর্থায়নের সর্বোচ্চ সীমা, রক্ষণাবেক্ষণ মার্জিন, মার্জিন কল, অর্থায়নযোগ্য সিকিউরিটিজ, ন্যূনতম বিনিয়োগ, একক সিকিউরিটিতে ঝুঁকির সীমাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন নিয়ম রাখা হয়েছে।
ইক্যুইটির চেয়ে বেশি ঋণ নয়
সংশোধিত বিধিমালায় কোনো মার্জিন অর্থায়নকারীকে গ্রাহকের ইক্যুইটির চেয়ে বেশি অর্থায়ন না করার নির্দেশনা থাকছে। অর্থাৎ গ্রাহকের নিজস্ব ইক্যুইটি এবং মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১ হবে।
পাশাপাশি কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার প্রকৃত মূলধন বা নিট সম্পদের চার গুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না।
রক্ষণাবেক্ষণ মার্জিন ৫০ শতাংশ
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি মার্জিন হিসাবে সার্বক্ষণিকভাবে গ্রাহকের ইক্যুইটি মোট মার্জিন অর্থায়নের অন্তত ৫০ শতাংশ থাকতে হবে। এই সীমার নিচে ইক্যুইটি নেমে গেলে গ্রাহককে তাৎক্ষণিকভাবে মার্জিন কল দিতে হবে।
মার্জিন কল লিখিতভাবে অথবা গ্রাহকের ই-মেইল ঠিকানা ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে দিতে হবে। প্রয়োজন হলে ফোন কলের মাধ্যমেও গ্রাহককে বিষয়টি জানানো যাবে।
মার্জিন কল দেওয়ার পর তিন ট্রেডিং দিবস পার হলেও গ্রাহক প্রয়োজনীয় মার্জিন জমা দিতে না পারলে তাকে নতুন করে কোনো অর্থায়ন করা যাবে না। তবে ইক্যুইটি ৫০ শতাংশে উন্নীত বা সমন্বয় করার জন্য সংশ্লিষ্ট হিসাবে থাকা প্রয়োজনীয় সিকিউরিটিজ বিক্রি করতে পারবে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান।
আর কোনো গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে তাকে কোনো নোটিশ না দিয়েই প্রয়োজনীয় সিকিউরিটিজ বিক্রি করার অধিকার থাকবে মার্জিন অর্থায়নকারীর।
নির্দিষ্ট সিকিউরিটিজেই মিলবে মার্জিন সুবিধা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মার্জিন অর্থায়নের যোগ্য সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শেয়ার ছাড়া অন্য কোনো সিকিউরিটিতে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না।
এ ছাড়া ‘জি’, ‘এন’ ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির সিকিউরিটিজে মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। এসএমই, অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এবং ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) প্ল্যাটফর্ম বা বোর্ডে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজও এই সুবিধার বাইরে থাকবে।
মার্জিন অর্থায়ন নেওয়ার সময় গ্রাহকের হিসাবে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে ন্যূনতম ৩ লাখ টাকার বিনিয়োগ থাকতে হবে। অন্যদিকে, মার্জিন অর্থায়নের অযোগ্য কোনো সিকিউরিটি গ্রাহক নিজের অর্থে কিনলে সেই সিকিউরিটির মূল্যকে মার্জিন ঋণের জন্য গ্রাহকের ইক্যুইটি হিসেবে গণনা করা যাবে না।
পিই ৪০ ছাড়ালে বন্ধ মার্জিন ঋণ
সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো সিকিউরিটির মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও ৪০-এর বেশি হলে সেই সিকিউরিটিতে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। একইভাবে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ঋণাত্মক হলেও সংশ্লিষ্ট শেয়ার মার্জিন সুবিধার জন্য অযোগ্য হবে।
তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিই রেশিওর পরিবর্তে মূল্য-সম্পদ অনুপাত বা পিবি রেশিও বিবেচনা করা হবে। কোনো জীবন বীমা কোম্পানির পিবি রেশিও ৩-এর বেশি হলে অথবা নিট সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক থাকলে ওই শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না।
মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটি নির্ধারণের জন্য সর্বশেষ ট্রেডিং দিনের সমাপনী মূল্য এবং সর্বশেষ চার প্রান্তিকের শেয়ারপ্রতি আয়ের ভিত্তিতে ট্রেইলিং পিই রেশিও হিসাব করা হবে। আর পিবি রেশিও নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে সর্বশেষ সমাপনী মূল্য এবং সর্বশেষ নিরীক্ষিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য।
মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটি শনাক্ত করার সুবিধার্থে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে নিয়মিতভাবে নিজেদের ওয়েবসাইটে পিই এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পিবি রেশিও প্রকাশ করতে হবে।
একক সিকিউরিটিতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অর্থায়ন
মার্জিন অর্থায়নকারীদের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কোনো একটি সিকিউরিটিতে অর্থায়নের সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার মোট বকেয়া মার্জিন অর্থায়নের ২০ শতাংশের বেশি কোনো একক সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বা অর্থায়ন করতে পারবে না।
আলাদা ব্যাংক হিসাব রাখতে হবে
গ্রাহকদের মার্জিন অর্থায়ন পরিচালনার জন্য অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নামে পৃথক ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে। ওই হিসাব কেবল মার্জিন অর্থায়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করা যাবে।
কোনো শাখা অফিস বা ডিজিটাল বুথের নামে এ ধরনের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ থাকবে না। এরই মধ্যে শাখা বা ডিজিটাল বুথের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর পর কমিশনের অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করা যাবে না।
মার্জিন চুক্তির মেয়াদ এক বছর
সংশোধিত নিয়মে মার্জিন চুক্তির মেয়াদ এক বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তির কোনো পক্ষ তা বাতিল না করলে মেয়াদ শেষে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে।
তবে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে ১৫ দিন আগে লিখিত নোটিশ দিয়ে মার্জিন অর্থায়নকারী অথবা গ্রাহক চুক্তিটি বাতিল করতে পারবেন।
একজন গ্রাহক একই মার্জিন অর্থায়নকারীর কাছে একই সময়ে একটি নগদ হিসাব এবং একটি মার্জিন হিসাব চালু রাখতে বা খুলতে পারবেন।
গঠন করতে হবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি
মার্জিন অর্থায়নকারীর নিজস্ব নীতিমালা এবং বিএসইসির বিধিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য কমপক্ষে দুই সদস্যের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকছে।
কমিটিকে বছরে অন্তত চারটি সভা করতে হবে। প্রতিটি সভার কার্যবিবরণী পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করতে হবে।
মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিএসইসির বিধিমালায় থাকা কোনো শর্ত শিথিল করতে পারবে না। একই সঙ্গে বিএসইসির বিধিমালার বাইরে নতুন কোনো শর্ত আরোপের সুযোগও থাকবে না।
গবেষণা দলের বেতন ট্রেডিং কমিশনের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের গবেষণা দলের সদস্যদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা সরাসরি ট্রেডিং কমিশন আয় বা কমিশনভিত্তিক আয়ের সঙ্গে যুক্ত না করার শর্ত রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করতে চাইলে সেখানে শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ধরনের মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালা শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড অথবা শরিয়াহ উপদেষ্টার সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণয়ন করতে হবে।
সংশোধিত বিধিমালার গেজেট প্রকাশের পর এসব নতুন বিধান কার্যকর হবে।


