নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নতুন করে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি–মার্চ প্রান্তিকে ব্যাংকটি ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান করেছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণ, বিপুল প্রভিশন ঘাটতি এবং মূলধন সংকট—সব মিলিয়ে ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ব্যাংকটির প্রকাশিত প্রাইস সেনসিটিভ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান (EPS) দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৭৯ পয়সা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মতে, ঋণ থেকে আয় হ্রাস, আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধির কারণেই এই লোকসান হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই লোকসান কেবল সাময়িক কর্মক্ষমতার দুর্বলতা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং গোপন ঋণ পরিস্থিতির বাস্তব প্রভাব এখন প্রকাশ পাচ্ছে।
সর্বশেষ নিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা, যা এক বছরে প্রায় ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট বিনিয়োগের প্রায় ৫১ শতাংশই খেলাপি ঋণ, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে একক ব্যাংক হিসেবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই ইসলামী ব্যাংকের অংশ।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনার সময়ে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট বড় অঙ্কের ঋণ প্রকৃত অবস্থার তুলনায় কম দেখানো হয়েছিল, যা এখন ধাপে ধাপে সামনে আসছে।
অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মন্দ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার প্রয়োজন থাকলেও বাস্তবে রাখা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা।
এছাড়া, ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (CAR) যেখানে ১২.৫০ শতাংশ থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে নেমে এসেছে ৬.৪২ শতাংশে। নিরীক্ষকদের মতে, পূর্ণ প্রভিশন সমন্বয় করা হলে মূলধন ঘাটতি আরও বাড়বে।
ব্যাংকের সংকটের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম স্টিলস, রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, ভেজিটেবল অয়েল এবং সুপার এডিবল অয়েলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ এখনো বকেয়া রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট শেয়ারের বড় অংশ বাজেয়াপ্ত করেছে। টানা দুই বছর ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামী ব্যাংক পুঁজিবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে, যার ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং শেয়ার দর ফ্লোর প্রাইসে আটকে রয়েছে।
এছাড়া ব্যাংকটির নিট বিনিয়োগ আয়ও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকায় নেমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত পুনর্গঠন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।


