ডমিনেজ স্টিলের আইপিও অর্থে অনিয়ম, ৫ পরিচালকসহ ৭ জনকে জরিমানা

সময়: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ ১১:৩১:২১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর মধ্যে কোম্পানিটির পাঁচ পরিচালককে প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা এবং সাবেক দুই কর্মকর্তাকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। ফলে সাতজনের ওপর আরোপিত মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা।

বিএসইসির পরিদর্শন ও তদন্ত প্রতিবেদনে ডমিনেজ স্টিলের আইপিওর অর্থ ব্যবহারে একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ২০২০ সালে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে কোম্পানিটি। প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যের ৩ কোটি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। কোম্পানির প্রসপেক্টাসে উল্লেখ ছিল, আইপিও থেকে পাওয়া অর্থ ভবন নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন, প্ল্যান্ট ও মেশিনারিজ কেনা এবং আইপিও-সংক্রান্ত ব্যয়ে ব্যবহার করা হবে।

তদন্তে আইপিওর অর্থ ব্যবহারের খাত পরিবর্তনের জন্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পূর্বানুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত তথ্য না জানিয়ে এবং জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রক্সি ভোট সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

আইপিওর অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত অনিয়মের একটি হলো ড্রেজার কেনা। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পূর্বানুমোদন না নিয়েই ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সিএসডি ডমিনেজ-৩’ নামের একটি ড্রেজার কেনে কোম্পানিটি। ২০২১ সালে ড্রেজারটি কেনার পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছরেও সেটি থেকে কোনো ব্যবসায়িক আয় হয়নি বলে বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে আরও বলা হয়, কেনার পর ড্রেজারটি কোনো ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হয়নি।

ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক ও মূল্য নিয়েও তদন্তে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কোম্পানির নথিতে ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক হিসেবে সুন্দরবন শিপবিল্ডার্সের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি লিখিতভাবে বিএসইসিকে জানায়, তারা ওই ড্রেজার তৈরি করেনি। এতে ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক সম্পর্কে কোম্পানির দেওয়া তথ্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া এবং নরসিংদীর পলাশে থাকা কোম্পানিটির দুটি কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। বিএসইসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানা দুটি বন্ধ থাকার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, এ ধরনের তথ্য মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তদন্তে আশুলিয়ার কারখানার শেড সম্প্রসারণের নির্মাণ ব্যয় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে আইপিওর অর্থ থেকে প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

এসব অনিয়মের ঘটনায় ডমিনেজ স্টিলের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, পরিচালক সুজিত সাহা, পরিচালক রকিবুল ইসলাম এবং পরিচালক আবুল কালাম ভূঁইয়াকে প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা করে জরিমানা করেছে বিএসইসি। একই আদেশে কোম্পানিটির সাবেক প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. জিল্লুর রহমান এবং সাবেক কোম্পানি সচিব মো. জামির হোসেন চৌধুরীকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, আরোপিত জরিমানার অর্থ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাংক ড্রাফট অথবা পে-অর্ডারের মাধ্যমে কমিশনে জমা দিতে হবে।

ডমিনেজ স্টিলের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ১০ কোটি ২৬ লাখ। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দশমিক ০২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৬১ দশমিক ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

বিএসইসির তদন্তে উঠে আসা এসব অনিয়মের ভিত্তিতেই কোম্পানিটির সংশ্লিষ্ট পাঁচ পরিচালক ও সাবেক দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোট ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইপিওর অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার, বিনিয়োগকারীদের সঠিক তথ্য জানানো এবং শেয়ারবাজারের প্রচলিত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

Share
নিউজটি ৫ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged