প্রি-ওপেনিং চালু ও বাইব্যাকের সুযোগ চায় শীর্ষ ব্রোকাররা

সময়: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ ১১:২৪:৫৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারের চলমান মন্দাবস্থা কাটিয়ে লেনদেনে স্বাভাবিকতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নতুন ট্রেডিং কৌশল ও পণ্য চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রি-ওপেনিং সেশন পুনরায় চালু এবং দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

বাজারে তারল্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপ কমানো, পরিদর্শন ও নজরদারি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত ও প্রক্রিয়াগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বোর্ডরুমে শীর্ষ ব্রোকারেজ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব প্রস্তাব উঠে আসে। পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল লেনদেন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, ডিএসইর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বৈঠকের শুরুতে নুজহাত আনোয়ার বলেন, পুঁজিবাজারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে অংশীজনদের মতামত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা জানা বৈঠকের প্রধান উদ্দেশ্য। অংশীজনদের যৌক্তিক ও গঠনমূলক পরামর্শ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব বিষয় ডিএসইর বোর্ড ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অবহিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি জানান, ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। সফটওয়্যারসহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক পাঁচটি ব্রোকারেজ-সংক্রান্ত ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের বিষয়েও ডিএসই কাজ করছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আলোচনায় প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। এর একটি হলো পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের কিছু অমীমাংসিত বিষয় এবং অন্যটি হলো বাজারের বর্তমান কঠিন ও হতাশাজনক পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতির কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি তা থেকে উত্তরণের পথ নির্ধারণ করাও আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য।

তিনি বলেন, অতীতের অমীমাংসিত বিষয় এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সম্মিলিতভাবে আলোচনা করা হলে কার্যকর সমাধানের পথ বের করা সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো ও বর্তমান সমস্যাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাবও দিতে হবে। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করলেই হবে না, এর সমাধানের পথও বের করতে হবে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, বাজারের স্থিতিশীলতা, তারল্য বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন থাকা বিষয়গুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও তারা জোর দেন।

এ সময় নতুন ট্রেডিং কৌশল ও পণ্য চালুর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা প্রি-ওপেনিং সেশন পুনরায় চালুর কারিগরি ও বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা যাচাইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ স্কিমের মেয়াদ এবং ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সময় বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনার প্রস্তাবও আসে। মেম্বারস মার্জিন নেট-অফের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যয় এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিনিধিরা।

পরিদর্শন ও নজরদারি কার্যক্রমকে আরও নিয়মিত, তথ্যনির্ভর, ঝুঁকিভিত্তিক এবং স্বচ্ছ করার প্রস্তাবও বৈঠকে দেওয়া হয়। বক্তারা সিস্টেমভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে স্বাভাবিক ট্রেডিং ভলিউমের পরিবর্তে অস্বাভাবিক মূল্য পরিবর্তন এবং প্রকৃত অনিয়মের লক্ষণকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তারা।

বক্তারা পুঁজিবাজারকে শুধু ইকুইটিনির্ভর অবস্থায় না রেখে বন্ডসহ অন্যান্য আর্থিক উপকরণের পরিধি বাড়ানোর ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ডিলারদের ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্ধারণে আরও স্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিগত ও প্রক্রিয়াগত বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার প্রস্তাবও দেন তারা। পাশাপাশি বিনিয়োগকারী-কেন্দ্রিক সেমিনার ও সংলাপ আয়োজন এবং উচ্চ সম্পদসম্পন্ন বিনিয়োগকারী ও প্রকৃত মার্কেট প্লেয়ারদের সঙ্গে ডিএসইর সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিনিধিরা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ চালুর সম্ভাবনা পর্যালোচনার আহ্বানও জানান তারা।

বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, ডিএসইর তথ্যপ্রযুক্তি ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা ইতোমধ্যে বোর্ড অনুমোদন করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিদর্শন ও নজরদারি কার্যক্রম আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজ চলছে। এর ফলে পরিদর্শন প্রক্রিয়া আরও কাঠামোবদ্ধ হবে এবং তথ্য সমন্বয় ও যাচাইয়ের কাজ সহজ হবে।

বিএসইসির উদ্যোগে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) এবং তথ্যপ্রযুক্তি দলের সমন্বয়ে নিয়মিত সভা আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান নুজহাত আনোয়ার। অনলাইনে হিসাব খোলা, খুচরা বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করা এবং টি+১ সেটেলমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে বলেও জানানো হয়।

নতুন ওয়েবসাইটের বিষয়ে নুজহাত আনোয়ার বলেন, এর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে ওয়েবসাইটটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় পুরোনো ওয়েবসাইট আরও দুই থেকে তিন মাস চালু রাখা হবে। এ সময় ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ডিএসইর কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার পাশাপাশি পুরো পুঁজিবাজারের ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হবে।

Share
নিউজটি ১ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged