দীর্ঘ মন্দার পর শেয়ারবাজারে বিদেশিদের ক্রয় বাড়ছে

সময়: সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ ৩:০১:২৬ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের বিক্রির চাপ ও বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে আবারও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাড়ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার উদ্যোগ, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) নিয়ম সহজ করার পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআইয়ের নিয়মিত পর্যালোচনায় ফেরার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে চলতি সেপ্টেম্বরের লেনদেনে—মাসের প্রথম ২৪ দিনে বিদেশিরা শেয়ার কেনায় এগিয়ে রয়েছেন, ফলে এ সময়ে তাদের নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। বিপরীতে বিক্রি করেছেন প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার। অর্থাৎ এ সময়ে তাদের নিট ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

এ সময় মোট ১৬ কার্যদিবসের মধ্যে ১৩ কার্যদিবসেই বিদেশিদের বিক্রির তুলনায় ক্রয়ের পরিমাণ বেশি ছিল। বাজারসংশ্লিষ্টদের কাছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এমন ধারাবাহিক ক্রয়কে দীর্ঘদিনের মন্দা পরিস্থিতির পর বাজারে তাদের অবস্থানের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া বেশ কিছু ইতিবাচক ও নমনীয় নীতিগত পদক্ষেপ বিনিয়োগ পরিবেশকে আগের তুলনায় সহজ করেছে। এসব উদ্যোগের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।

বিএসইসি ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পাশাপাশি ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মার্জিন ঋণের বিধিমালা সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভালো কোম্পানির বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও বিনিয়োগের ক্ষেত্র বিস্তৃত হতে পারে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআইয়ের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এমএসসিআই ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশের সূচক নিয়ে তাদের নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া আবার চালু হবে।

এর আগে ২০২৩ সালে ফ্লোর প্রাইসসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাংলাদেশকে ‘বিশেষ নজরদারি’-তে রাখা হয়েছিল। সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনায় ফেরার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ থেকে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রির অর্থ বিদেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদন প্রয়োজন হতো। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সীমা বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত করেছে।

এ ছাড়া প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে চার্টার্ড হিসাবরক্ষক প্রতিষ্ঠানের সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে ব্যাংকগুলোকে সরাসরি কর কেটে অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিবর্তনের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের সাম্প্রতিক চিত্রেও পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বিদেশিদের মোট লেনদেন নেমে এসেছিল মাত্র ৭৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এরপর জুন মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৪০ কোটি টাকা। জুলাইয়ে বিদেশিদের লেনদেন ছিল প্রায় ৫২৩ কোটি টাকা।

আগস্টে লেনদেন কিছুটা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩১৮ কোটি টাকা। তবে সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই বিদেশিদের মোট লেনদেন ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

অর্থাৎ মে মাসের তলানি থেকে পরবর্তী সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাজারে লেনদেনের সক্রিয়তা ধীরে ধীরে বেড়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।

তবে বাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে বিদেশিদের শেয়ারধারণ রয়েছে মাত্র ১৩২টি কোম্পানিতে। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগ এখনো সীমিত সংখ্যক কোম্পানির মধ্যেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে।

বিদেশিদের সবচেয়ে বেশি শেয়ারধারণ রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকে, যেখানে তাদের অংশগ্রহণ প্রায় ৩৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশি শেয়ারধারণ রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজে, যা ২৫ শতাংশের বেশি।

এ ছাড়া বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং রেনাটা লিমিটেডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি শেয়ার রয়েছে।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) নামে থাকা বিও হিসাবের সংখ্যা ৪১ হাজার ৯৩৭টি।

Share
নিউজটি ৩ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged