ইউনাইটেড গ্রুপের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখবে বিএসইসি

সময়: শুক্রবার, অক্টোবর ৯, ২০২৬ ১২:১৬:২৫ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সুরক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (কেপিসিএল), ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডসহ (ইউপিজিডিসিএল) কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেনে সম্ভাব্য ইনসাইডার ট্রেডিং ও বাজার কারসাজির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি।

গত ৭ অক্টোবর বিএসইসির প্রকাশিত সংশোধিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট লেনদেনে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা হাসান মাহমুদ রাজা এবং ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের (ইউইসিএল) চেয়ারম্যান মঈনউদ্দিন হাসান রশিদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করা হবে।

অভিযোগের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য বিএসইসির পরিচালক মোহাম্মদ শামসুর রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন বিএসইসির যুগ্ম পরিচালক জিয়াউর রহমান এবং সহকারী পরিচালক আলী আহসান। সংশোধিত নির্দেশনা জারির তারিখ থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে কমিশনের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে কমিটিকে বলা হয়েছে।

বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের পরিদর্শন ও তদন্ত শাখা থেকে জারি করা আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, শেয়ারবাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় অভিযোগগুলোর বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন।

এম এম হাবিবুল্লাহ ও নুরুজ্জামান জিন্নাহর করা আবেদনের ভিত্তিতেই মূলত এই তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্য ব্যক্তির নামে খোলা বেনামি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব এবং লেনদেন হিসাব ব্যবহার করে প্রকৃত মালিকানার পরিচয় আড়াল করা হয়েছে। এসব হিসাবের মাধ্যমে বেআইনি ইনসাইডার ট্রেডিং ও শেয়ারের দাম কারসাজির ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

তদন্তের অংশ হিসেবে ইউনাইটেড পাওয়ার, এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান, মালিকানাসংশ্লিষ্ট সংস্থা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, সহযোগী ব্যক্তি এবং নিকটাত্মীয়দের নামে থাকা প্রাসঙ্গিক ব্যাংক হিসাব, বিও হিসাব ও লেনদেন হিসাবের বিস্তারিত তথ্য পরীক্ষা করা হবে। এসব হিসাব প্রকৃতপক্ষে কারা নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করতেন এবং লেনদেনের মাধ্যমে কারা চূড়ান্তভাবে লাভবান হয়েছেন, তা শনাক্ত করার উদ্যোগ নেবে তদন্ত কমিটি।

শেয়ার কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ কীভাবে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে স্থানান্তরিত হয়েছে, তাও অনুসন্ধানের আওতায় থাকবে। ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড (ইউইসিএল), এর কোনো অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, তা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হবে। পাশাপাশি শেয়ার লেনদেন থেকে পাওয়া নগদ লভ্যাংশ ও অন্যান্য আয়ের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, তা নির্ধারণে অর্থের উৎস ও প্রবাহ অনুসরণ করা হবে।

সন্দেহভাজন বিও হিসাবগুলোতে সংরক্ষিত শেয়ারের প্রকৃত মালিকানা এবং সেগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখবে কমিটি। জটিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা কিংবা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ব্যবহার করে প্রকৃত মালিকের পরিচয় গোপন করা হয়েছিল কি না, তা-ও তদন্তে যাচাই করা হবে।

এ ছাড়া ইউনাইটেড পাওয়ার ও কেপিসিএলসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো, প্রতারণামূলক কৌশল প্রয়োগ কিংবা সংঘবদ্ধভাবে বাজার কারসাজির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা অনুসন্ধান করা হবে। কোম্পানিগুলোর মূল্যসংবেদনশীল তথ্য বা পিএসআই ব্যবহার করে অসাধু লেনদেন করা হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট তথ্য কারা জানতেন এবং কীভাবে সেগুলো আদান-প্রদান করা হয়েছে, সেসব বিষয়ও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইউনাইটেড গ্রুপের হাসান মাহমুদ রাজা ও ইউইসিএলের চেয়ারম্যান মঈনউদ্দিন হাসান রশিদের পাশাপাশি অভিযোগকারী এম এম হাবিবুল্লাহ ও নুরুজ্জামান জিন্নাহ এবং অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বেআইনি সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা-ও নির্ধারণ করবে তদন্ত কমিটি।

তদন্তের আওতা শুধু অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট শেয়ার ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং অন্যান্য আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হবে। হিসাব খোলা, শেয়ার কেনার আদেশ কার্যকর করা, লভ্যাংশ বিতরণ এবং অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো ধরনের অবহেলা কিংবা অনিয়মে সহযোগিতার ভূমিকা ছিল কি না, তা যাচাই করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজ আইন, ইনসাইডার ট্রেডিং নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, অননুমোদিত হিসাব পরিচালনা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানার পরিচয় গোপনসংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করাই এই তদন্তের প্রধান উদ্দেশ্য।

বিএসইসির এই উদ্যোগকে শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সামগ্রিক সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্তে নির্ধারিত বিষয়গুলোর বাইরে অভিযোগসংশ্লিষ্ট অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা চাঞ্চল্যকর তথ্য কিংবা প্রমাণ পাওয়া গেলে সেগুলোকেও অনুসন্ধানের আওতায় আনা যাবে। ফলে তদন্ত চলাকালে নতুন কোনো অনিয়মের তথ্য সামনে এলে তা যাচাই করার সুযোগও রাখা হয়েছে।

Share
নিউজটি ৪ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged