শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়: মাসুদ খান

সময়: বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২৬ ৪:০৩:১৩ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৪৬ বছরের করপোরেট জীবনে অর্জিত সুনাম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত সহধর্মিণীর পরামর্শেই তিনি বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, করপোরেট জীবনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর দেশের জন্য কিছু করার দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘সিএমজেএফ টক’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফের সভাপতি মনির হোসেন এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেল।

মাসুদ খান বলেন, শুরুতে তিনি বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তাবে সম্মতি দেননি। কারণ অনেকেই তাকে সতর্ক করেছিলেন যে, বিএসইসিতে দায়িত্ব পালন করতে এসে অতীতে অনেকেই বিতর্কের মুখে পড়েছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম নষ্ট না করার পরামর্শও তিনি পেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “আমি প্রথমে না করে দিয়েছিলাম। পরে সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে আশ্বস্ত করা হয় যে, পুঁজিবাজার সংস্কারে সরকার আন্তরিক এবং আমাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হবে না।”

বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, বিষয়টি তিনি রাতে তার স্ত্রীকে জানালে তিনি ইস্তেখারা করার পরামর্শ দেন। পরদিন সকালে তার স্ত্রী জানান, ইস্তেখারার ফল অনুযায়ী এই দায়িত্ব গ্রহণ করাই তার জন্য উত্তম হবে।

মাসুদ খান বলেন, “আমার স্ত্রী আমাকে বলেছিলেন, করপোরেট জীবনে তোমার যা পাওয়ার ছিল তা তুমি পেয়েছ। এখন দেশের জন্য কিছু করার সময়। দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার প্রয়োজন।”

তিনি আরও জানান, বিএসইসির দায়িত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত প্রায় তিন মাস আগেই চূড়ান্ত হয়েছিল। ওই সময় তিনি পুরোটা পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যয় করেন। করপোরেট অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আমরা কোনো কাজের ৮০ শতাংশ সময় পরিকল্পনায় ব্যয় করি এবং ২০ শতাংশ সময় বাস্তবায়নে। তাই যোগদানের আগেই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিলাম।”

মাসুদ খান বলেন, কমিশনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করাকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এ কারণে করপোরেট আইন ও পুঁজিবাজার বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিতে রাজি করাতে তাকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথাও তুলে ধরেন। এর মধ্যে দীর্ঘদিনের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিদেশে তালিকাভুক্ত কোম্পানির গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিপ্ট (জিডিআর)-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয় উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বাজার তদারকিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-কে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অস্বাভাবিক শেয়ারদর বৃদ্ধি হলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং তালিকাভুক্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বিএসইসির পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে।

বাজেটে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তঃকোম্পানি লভ্যাংশের ওপর করের চাপ কমানো, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার, জিরো কুপন বন্ডে কর অব্যাহতি এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিভিন্ন কর-সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে পুনরুজ্জীবিত করাকে নিজের অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি শেয়ার কেনার পরিবর্তে পেশাদার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে।

এ ছাড়া লাইসেন্সধারী আর্থিক পরামর্শক (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার) ব্যবস্থা চালু, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া আরও সহজ করা, নতুন কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান বিধিবিধানকে বাজারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সবশেষে মাসুদ খান বলেন, “একটি প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া দেশের অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”

Share
নিউজটি ২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged