শেয়ারবাজারে বড় পরিবর্তনের প্রস্তুতি, কমোডিটি ডেরিভেটিভস চালু হচ্ছে

সময়: মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬ ৬:৫৫:১৮ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য যুক্ত করতে কমোডিটি ডেরিভেটিভস বাজার চালুর প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন এ বাজার চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। বাজারটি চালু হলে প্রচলিত শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিআরও) মোহাম্মদ মাহাদি হাসান এসব তথ্য জানিয়েছেন।

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত সিএসইর কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অনুষ্ঠানে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ মাহাদি হাসান জানান, কমোডিটি ডেরিভেটিভস বাজার চালুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে নতুন এই বাজার কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, এর সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। বর্তমানে সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নতুন কমোডিটি ডেরিভেটিভস বাজার কতটা সফল হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। এ কারণে বাজারটি চালুর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এর কার্যক্রম, সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

মোহাম্মদ মাহাদি হাসানের মতে, নতুন বিনিয়োগ পণ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরির জন্য বিনিয়োগকারীদের যথাযথ ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া নতুন ধরনের বিনিয়োগ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া হলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে সিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বলেন, দেশের অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বলতে শুধু বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বা সিকিউরিটিজ কেনাবেচাকেই বোঝায়। কিন্তু আধুনিক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ আরও বিস্তৃত।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের এই সীমিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ), বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ পণ্য রয়েছে। এসব পণ্যের বৈশিষ্ট্য, কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য সুবিধা সম্পর্কে জানতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের এসব পণ্যে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট খাত বা পণ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ পণ্যে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। এ জন্য বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনা বা ডাইভারসিফিকেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মোহাম্মদ মাহাদি হাসান বলেন, বর্তমানে যারা শিক্ষাজীবনে রয়েছেন, তারাই ভবিষ্যতে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী হিসেবে অংশ নেবেন। তাদের মধ্য থেকেই অনেকে ভবিষ্যতে বাজারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবেন।

এ কারণে শিক্ষাজীবন থেকেই শেয়ারবাজার সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে, বাস্তব কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা থাকলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও পেশাগত জীবনে শিক্ষার্থীরা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে সিএসইর উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এবং সার্ভিল্যান্স বিভাগের প্রধান আরিফ আহমেদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসারের কারণে বিভিন্ন পেশায় দক্ষতা ও যোগ্যতার ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে।

এ অবস্থায় পেশাগত দক্ষতা ধরে রাখতে হলে নিয়মিত নতুন জ্ঞান অর্জন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়েই পড়াশোনা করুন না কেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর না করে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক জ্ঞান এবং বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে।

তার মতে, পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে নিয়মিত শেখার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের অধ্যাপক নাজনীন জাহান চৌধুরী বলেন, ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীদের জন্য শেয়ারবাজার, বিনিয়োগব্যবস্থা এবং স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যক্রম সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধু পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি বাস্তবে শেয়ারবাজার কীভাবে পরিচালিত হয়, বিনিয়োগের বিভিন্ন পণ্য কীভাবে কাজ করে এবং বাজার পরিচালনার সঙ্গে কোন কোন প্রক্রিয়া জড়িত, সেসব বিষয়েও বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করা জরুরি।

বিশেষ করে শেয়ারবাজারে নতুন ধরনের বিনিয়োগ পণ্য চালুর উদ্যোগ এবং এসব পণ্যের কার্যক্রম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক নাজনীন জাহান চৌধুরীর মতে, তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে।

অনুষ্ঠানে আইআইইউসির সহযোগী অধ্যাপক মো. আরিফুল হক বলেন, ভবিষ্যতে যারা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের শিক্ষাজীবন থেকেই বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

শুধু প্রচলিত ধারণা কিংবা অন্যের সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তার মতে, শিক্ষাজীবনে বাজার সম্পর্কে বাস্তব ধারণা অর্জন করলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

সিএসই আয়োজিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ পণ্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি, সম্ভাব্য মুনাফা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জের উদ্যোগে দেশে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এবং এ পর্যন্ত বাস্তবায়িত কার্যক্রমের অগ্রগতিও শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়।

এ ছাড়া শেয়ারবাজারের সামগ্রিক কার্যক্রম, বিনিয়োগ পণ্যের বৈশিষ্ট্য এবং স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবহারিক পরিচালন পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করা হয়।

অনুষ্ঠানের পুরো অধিবেশন পরিচালনা করেন সিএসইর প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বিভাগের প্রধান এম সাদেক আহমেদ। এ সময় তিনি শেয়ারবাজারের সার্বিক কার্যক্রম এবং স্টক এক্সচেঞ্জের বাস্তব পরিচালন পদ্ধতি নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেন।

অনুষ্ঠানে সিএসইর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহাদি হাসান এবং উপমহাব্যবস্থাপক ও সার্ভিল্যান্স বিভাগের প্রধান আরিফ আহমেদ।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক নাজনীন জাহান চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক মো. আরিফুল হক এবং সহকারী অধ্যাপক ড. নাজিম উল্লাহ।

সিএসইর এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শেয়ারবাজারের প্রচলিত বিনিয়োগব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন কমোডিটি ডেরিভেটিভস বাজার সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা অর্জনের সুযোগ পান। একই সঙ্গে নতুন বাজার চালুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে, যা দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

Share
নিউজটি ২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged