পিইপি-আইপির হিসাব ও অস্বাভাবিক লেনদেনে বিশেষ নজরদারি

সময়: বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬ ৭:০০:১১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে অবৈধ অর্থের প্রবাহ ও অর্থপাচার প্রতিরোধে নজরদারি আরও কঠোর করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন নির্দেশনার আওতায় শেয়ারবাজারে লেনদেন করা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, দেশীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাবগুলো বিশেষ পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হবে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিএফআইইউ এ বিষয়ে ‘সার্কুলার নং-৩১’ জারি করে শেয়ারবাজারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে জারি করা এই নির্দেশনায় ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজারসহ শেয়ারবাজারের সব মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ অথবা সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নিয়ে সেই নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রধান কার্যালয়ে চিফ অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসারের (ক্যামলকো) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট (সিসিইউ) গঠন এবং শাখা পর্যায়ে শাখা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা (বিএএমএলকো) নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

নতুন গ্রাহকের হিসাব খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট অথবা জন্মনিবন্ধন সনদের মতো নির্ভরযোগ্য নথির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ই-কেওয়াইসি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।

কোনো কোম্পানির ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারধারী এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদের প্রকৃত সুবিধাভোগী বা ‘বেনিফিশিয়ারি ওনার’ হিসেবে শনাক্ত করতে হবে। এ ধরনের ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানির মালিকানা ও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের তথ্য গোপন রেখে লেনদেনের সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি (পিইপি), দেশীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি (আইপি), আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বা ‘এনহ্যান্সড ডিউ ডিলিজেন্স’ (ইডিডি) গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ অথবা অফশোর কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

এ ছাড়া কোনো গ্রাহকের সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অথবা বাংলাদেশ সরকারের তালিকাভুক্ত নিষিদ্ধ কিংবা সন্ত্রাসী সত্তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

লেনদেন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বিএফআইইউ। কোনো অস্বাভাবিক, জটিল কিংবা আর্থিকভাবে অসংগতিপূর্ণ লেনদেন শনাক্ত হলে শাখা পরিপালন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিটকে অবহিত করতে হবে। পর্যালোচনার পর লেনদেনটি সন্দেহজনক বলে নিশ্চিত হলে ‘গো-এএমএল’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গোপনীয়তা বজায় রেখে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট (এসটিআর) জমা দিতে হবে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি ছয় মাসে একবার স্ব-মূল্যায়ন করতে হবে। জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর—এই দুই মেয়াদে মূল্যায়ন সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এর সারসংক্ষেপ বিএফআইইউতে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগকে এসব কার্যক্রম স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে।

কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও পটভূমি যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক বা হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় লেনদেনের নথিপত্র কমপক্ষে পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বিএফআইইউর নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে শেয়ারবাজারে বেনামে লেনদেন, অবৈধ অর্থের প্রবাহ এবং অর্থপাচারের ঝুঁকি শনাক্তে নজরদারি আরও জোরদার হবে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারের লেনদেনে গ্রাহকের পরিচয়, প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থের উৎস যাচাইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রক নজরদারি আরও শক্তিশালী হবে।

Share
নিউজটি ৩ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged